বেগম খালেদা জিয়ার জীবনি

Image 268626 1767176225 Image 268626 1767176225
Image 268626 1767176225

মুখবন্ধ: ইতিহাসের মুখোমুখি একজন রাজনৈতিক নেত্রী

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কটি নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত, বিতর্কিত এবং তাৎপর্যপূর্ণ, বেগম খালেদা জিয়া তাদের মধ্যে অন্যতম। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে আকস্মিক রাজনৈতিক ঝটিকার মুখে দলের হাল ধরা, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আপসহীন লড়াই, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ কারাবাস ও আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছেন।

তাঁর জীবন কেবল একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক উত্থান-পতনের গল্প নয়; বরং এটি স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের গণতন্ত্রায়ন, সংসদীয় পদ্ধতির পুনর্বিন্যাস, অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর এবং দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই জীবনীটিতে কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত বা অন্ধ প্রশংসার ঊর্ধ্বে ওঠে ঐতিহাসিক দলিল, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, আদালতের নথি এবং বিভিন্ন পক্ষের মূল্যায়নের ভিত্তিতে খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।

প্রথম অধ্যায়: জন্ম, পরিবার ও শৈশব

জন্ম ও জন্মতারিখ নিয়ে বিতর্ক

বেগম খালেদা জিয়ার জন্মতারিখ ও জন্মস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। বিএনপির রাজনৈতিক নথিপত্র ও বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে তাঁর জন্মতারিখ ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট উল্লেখ করা হয়। তবে তাঁর জন্মসাল ও তারিখ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমত ও বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল এবং সেসময়ের কিছু নথিতে ভিন্ন সালের কথাও বলা হয়েছে। তবে প্রামাণ্য রাজনৈতিক ইতিহাস এবং দলীয় দলিল অনুযায়ী ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্টকেই তাঁর জন্মতারিখ হিসেবে বহুলভাবে গণ্য করা হয়। তিনি ব্রিটিশ ভারতের বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায় জন্মগ্রহণ করেন।

পারিবারিক পটভূমি ও শৈশব

খালেদা জিয়ার পৈতৃক নিবাস ছিল ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়ি। তাঁর পিতা এস্কান্দার আলী মজুমদার এবং মাতা বেগম তৈয়বা মজুমদার। পিতা এস্কান্দার আলী মজুমদার পেশায় একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। চার ভাইবোনের মধ্যে খালেদা জিয়া ছিলেন তৃতীয়। শৈশবে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘পুতুল’।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তাঁর পরিবার সচ্ছল ও রক্ষণশীল উভয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল। তাঁর শৈশব কেটেছে জলপাইগুড়িতেই, যেখানে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তাঁর পরিবার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। জলপাইগুড়ির মিশন গার্লস হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি পরবর্তীতে ১৯৫৯-৬০ সালের দিকে দিনাজপুরের গার্লস হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন (মাধ্যমিক) পাশ করেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়: বিবাহ, পারিবারিক জীবন ও সামরিক পরিমণ্ডল

বিবাহ ও পারিবারিক জীবন

১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা জিয়ার বিবাহ হয়। সেসময়ে সামরিক পরিবারের জীবনযাত্রা ছিল কঠোর শৃঙ্খলা ও নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ। বিবাহের পর তিনি গৃহিণী হিসেবে সংসার জীবন শুরু করেন এবং স্বামীর কর্মস্থলের সুবাদে পাকিস্তানের বিভিন্ন সেনানিবাসে বসবাস করেন।

তাঁদের সংসারে দুই পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন—তারেক রহমান (জন্ম ১৯৬৫) এবং আরাফাত রহমান কোকো (জন্ম ১৯৬৯)। সামরিক কর্মকর্তার পত্নী হিসেবে তাঁর জীবন মূলত গৃহকোণ এবং পারিবারিক পরিমণ্ডলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই সময়ে রাজনীতিতে তাঁর প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা ছিল না।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় জিয়াউর রহমান তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর হিসেবে চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, যা মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতিকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

যুদ্ধের পুরো সময়টায় খালেদা জিয়া ও তাঁর দুই শিশুসন্তান পাকিস্তানি বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় আত্মগোপন করে কাটিয়েছেন। অবশেষে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন। সামরিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের এই চরম অনিশ্চয়তার দিনগুলো তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে এবং পরবর্তী জীবনের মানসিক দৃঢ়তা অর্জনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

তৃতীয় অধ্যায়: মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ ও জিয়াউর রহমানের উত্থান

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল অত্যন্ত সংক্ষুব্ধ ও অস্থির। অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক হানাহানি এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সেনাপ্রধান হিসেবে ক্ষমতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং বহুদলীয় রাজনীতির ধারা পুনরায় চালু করেন। তাঁর শাসনামলে দেশে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা, খাল কাটা কর্মসূচি এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতির সূচনা হয়। তবে তাঁর সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিয়ে সমর্থক ও সমালোচকদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। একপক্ষ তাঁকে আধুনিক বাংলাদেশের অন্যতম রূপকার ও সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অভিহিত করেন, অন্যদিকে সমালোচকেরা তাঁকে সামরিক স্বৈরাচার এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কুশীলব হিসেবে চিহ্নিত করেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। এই আকস্মিক হত্যাকাণ্ডে দেশ এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে এবং খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়।

চতুর্থ অধ্যায়: রাজনীতিতে প্রবেশ ও বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ

পতির মৃত্যুর পর বিএনপি চরম নেতৃত্ব সংকট ও ভাঙনের মুখে পড়ে। দলটিকে টিকিয়ে রাখতে এবং নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে দলের সিনিয়র নেতাদের অনুরোধে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

রাজনীতিতে প্রবেশ

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। শুরুতে রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেকেই তাঁকে কেবল একজন প্রতীকী মুখ হিসেবে দেখেছিলেন। তবে তিনি দ্রুত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝতে শুরু করেন এবং দলের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৮৪ সালের মার্চ মাসে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তিনি দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন।

পঞ্চম অধ্যায়: এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম

সামরিক শাসনের সূচনা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। তিনি সংবিধান স্থগিত করে সামরিক আইন জারি করেন। এরশাদ সরকারের এই ক্ষমতা দখল স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে এবং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার জন্ম দেয়।

ক্ষমতায় আসার পর এরশাদ সরকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং পর্যায়ক্রমে নিজস্ব রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় পার্টি’ গঠন করে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। এই প্রেক্ষাপটে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত হতে শুরু করে।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ও বিএনপির কৌশল

১৯৮৪ সালে বিএনপির একক চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর খালেদা জিয়া দ্রুত গৃহবধূর ভূমিকা থেকে একজন রাজপথের রাজনৈতিক নেতায় রূপান্তরিত হন। এরশাদ সরকারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেন।

বিএনপির অভ্যন্তরে অনেকে সেসময় এরশাদ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা আপস করার পক্ষে মতামত দিলেও খালেদা জিয়া সামরিক সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তাঁর এই দৃঢ় মনোভাবের কারণেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে অভিহিত করা শুরু হয়।

তিনি দলকে পুনর্গঠন করতে সারা দেশ সফর করেন, তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনকে কেবল রাজধানী কেন্দ্রিক না রেখে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেন।

জোটে সংঘাত ও আন্দোলন: ৭ দল, ১৫ দল এবং ৮ দল

সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করতে ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন জোট গড়ে ওঠে:

  1. ৭ দলীয় জোট: বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নিয়ে গঠিত।

  2. ১৫ দলীয় জোট: শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগসহ বামপন্থী ও প্রগতিশীল দলগুলো নিয়ে গঠিত (পরবর্তীতে এটি ভেঙে ৮ দলীয় জোট ও ৫ দলীয় জোটে রূপান্তরিত হয়)।

  3. জামায়াতে ইসলামী ও বাম দলসমূহ: এরা নিজেদের অবস্থান থেকে পৃথকভাবে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যায়।

এই জোটগুলোর মূল দাবি ছিল সামরিক সরকারের পদত্যাগ, সামরিক আইন প্রত্যাহার এবং নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।

১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচন বর্জন

১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকার সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। আন্দোলনের চরম পর্যায়ে আওয়ামী লীগ, সিপিবিসহ কিছু দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যা তৎকালীন আন্দোলনকে কিছুটা ধাক্কা দেয়।

তবে খালেদা জিয়া ও তাঁর ৭ দলীয় জোট এরশাদ সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত ১৯৮৬ সালের ৩ মে-র জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে বর্জন করে। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনও বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় জোটই বর্জন করে। নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে খালেদা জিয়া জনগণের মাঝে নিজের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সততার স্থান সুদৃঢ় করেন।

১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান ও এরশাদের পতন

১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল:

  • সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের উত্থান: ১০ অক্টোবর ছাত্রনেতা নজির উদ্দিন জেহাদ পুলিশের গুলিতে শহীদ হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’ গঠিত হয়, যা আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।

  • রাজনৈতিক দলগুলোর যৌথ ঘোষণা: ১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর ৭ দল, ৮ দল ও ৫ দলীয় জোট যৌথ রূপরেখা ঘোষণা করে। এতে এরশাদের পদত্যাগ এবং নিরপেক্ষ নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানানো হয়।

  • গণ-অভ্যুত্থান ও পদত্যাগ: ডক্টর সামসুল আলম খান মিলন পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর পেশাজীবী, শ্রমিক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে আসেন। ২৭ নভেম্বর সারাদেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হলেও তা মেনে নিতে জনগণ অস্বীকার করে। পরিশেষে সামরিক বাহিনীর তৎকালীন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অনিচ্ছার কারণে এরশাদ একঘরে হয়ে পড়েন।

১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং ৬ ডিসেম্বর নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এর মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ সুগম হয়।

ষষ্ঠ অধ্যায়: ১৯৯১ সালের নির্বাচন ও প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্ব

১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তৎকালীন নির্বাচনে মূল লড়াই হয় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের মধ্যে।

দল / জোট বিজয়ী আসন সংখ্যা
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১৪০
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৮৮
জাতীয় পার্টি ৩৫
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১৮
অন্যান্য ও স্বতন্ত্র ১৯

নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (১৫১ আসন) না পেলেও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনের ভিত্তিতে সরকার গঠন করে। ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

সংসদীয় পদ্ধতির পুনঃপ্রবর্তন ও সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী

১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা কার্যকর ছিল। ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর বিএনপি ও বিরোধী দল আওয়ামী লীগ যৌথভাবে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়।

  • দ্বাদশ সংশোধনী বিল (১৯৯১): ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদে সংবিধানের ১২তম সংশোধনী বিল পাস হয়। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা পুনরায় প্রবর্তন করা হয়, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়।

  • ঐকমত্যের রাজনীতি: দলীয় বিভেদ ভুলে সংসদীয় পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার এই যৌথ উদ্যোগকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হয়।

১৯৯১–১৯৯৬: অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি

খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদকালে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়:

  1. মুক্তবাজার অর্থনীতি ও সংস্কার: তাঁর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারা জোরদার করে। শুল্ক হ্রাস, ব্যক্তিগত বিনিয়োগে উৎসাহ দান এবং বেসরকারীকরণ বোর্ড গঠনের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

  2. ভ্যাট (VAT) চালু: ১৯৯১ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশে প্রথম মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থা চালু করা হয়, যা দেশের রাজস্ব আদায়ে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল।

  3. নারীশিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা:

    • ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বালিকাদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করা হয়, যা পল্লী অঞ্চলে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।

    • প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয় এবং ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা’ কর্মসূচি শুরু করা হয়।

  4. অবকাঠামো উন্নয়ন: যমুনা নদীর ওপর নির্মিত ‘বঙ্গবন্ধু সেতু’ (তৎকালীন যমুনা বহুমুখী সেতু) প্রকল্পের কাজ বেগবান করা এবং মূল অর্থায়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বিতর্ক, সংসদ বর্জন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি

সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে এসে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয়। ১৯৯৪ সালে মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলে বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী সংসদ বর্জন শুরু করে।

  • তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি: মাগুরা উপনির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলো নিরপেক্ষ ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থার অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের আইনি দাবিসংবলিত আন্দোলন শুরু করে।

  • রাজনৈতিক সংঘাত ও পদত্যাগ: বিএনপি সরকার শুরুতে এই দাবি অসাংবিধানিক যুক্তি দেখিয়ে প্রত্যাখ্যান করে। বিরোধী দলগুলোর টানা সংসদ বর্জন, গণ-পদত্যাগ এবং লাগাতার হরতাল ও অবরোধের কারণে দেশে অর্থনৈতিক অচলবস্থা সৃষ্টি হয়।

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ

রাজনৈতিক সংকটের মুখেই ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান প্রধান বিরোধী দল এই নির্বাচন বর্জন করে।

নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি পুনরায় সরকার গঠন করলেও সেই সরকারের মেয়াদ ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত (মাত্র ১২ দিন)। রাজনৈতিক সংকট সমাধানের লক্ষ্যে এবং জনদাবির মুখে খালেদা জিয়ার সরকার সংসদে संविधानের ত্রয়োদশ সংশোধনী বিল পাস করে, যার মাধ্যমে নিরপেক্ষ ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ সংবিধানের স্থায়ী অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

পাস করার পর ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন এবং ষষ্ঠ সংসদ ভেঙে দিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।

সপ্তম অধ্যায়: বিরোধী রাজনীতি ও ১৯৯৬–২০০১ সময়কাল

১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন ও বিরোধী দলের নেতৃত্ব

১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

  • নির্বাচনী ফলাফল: নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠন করে। বিএনপি ১১৬টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

  • খালেদা জিয়ার ভূমিকা: খালেদা জিয়া জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নির্বাচনে পরাজিত হলেও বিএনপি ১১৬টি আসন পেয়ে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে সংসদীয় রাজনীতিতে অবস্থান সুদৃঢ় করে।

১৯৯৬–২০০১ মেয়াদে রাজনৈতিক কৌশল ও সংঘাত

বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা শুরু করেন:

  1. পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি (১৯৯৭): ১৯৯৭ সালে তৎকালীন সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে। খালেদা জিয়া ও বিএনপি এই চুক্তির সমালোচনা করে দাবি করে যে, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতাকে ক্ষুণ্ন করবে এবং এতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা হ্রাস পাবে। এই চুক্তির প্রতিবাদে বিএনপি ‘লং মার্চ’ কর্মসূচি পরিচালনা করে।

  2. গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি (১৯৯৬): ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে বিএনপি অভিযোগ করে যে, এতে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করা হয়নি এবং এটি একটি একতরফা চুক্তি।

  3. সংসদ বর্জন ও রাজপথের আন্দোলন: আগের মেয়াদের ধারাবাহিকতায় বিএনপিও বিভিন্ন মেয়াদে জাতীয় সংসদ বর্জন করে এবং সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করে।

চারদলীয় জোট গঠন (১৯৯৯)

২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক শক্তি পুনর্গঠনের জন্য ১৯৯৯ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ‘চারদলীয় জোট’ গঠিত হয়।

এই জোটের শরিক দলগুলো ছিল:

  1. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)

  2. জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর-এরশাদ অংশ)

  3. বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

  4. ইসলামী ঐক্যজোট

কৌশলগতভাবে ভোট বিভাজন রোধ করা এবং ইসলামপন্থী দলগুলোর সমর্থন এক ছাতার নিচে নিয়ে আসাই ছিল এই জোটের প্রধান রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। তবে জামায়াতে ইসলামীকে জোটভুক্ত করার কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয় বিএনপিকে।

অষ্টম অধ্যায়: ২০০১ সালের নির্বাচন ও দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রিত্ব

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন ও বিশাল বিজয়

২০০১ সালের ১ অক্টোবর তৎকালীন লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

চারদলীয় জোট এক অভূতপূর্ব কৌশলগত সাফল্য অর্জন করে এবং জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন লাভ করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০১) - আসন বিন্যাস:
==================================================
[████████████████████████████████████] চারদলীয় জোট (১৯৩ আসন)
[████████] আওয়ামী লীগ (৬২ আসন)
[██] জাতীয় পার্টি (ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট) (১৪ আসন)
[█] অন্যান্য ও স্বতন্ত্র (৩১ আসন)
==================================================

২০০১ সালের ১০ অক্টোবর বেগম খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

২০০১–২০০৬ মেয়াদে সরকারের উন্নয়ন ও সামাজিক অর্জন

দ্বিতীয় মেয়াদে খালেদা জিয়ার সরকার অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে:

  • অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: দেশের জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৫.৫% থেকে ৬%-এর উপরে উন্নীত হয়।

  • রপ্তানি ও প্রবাসী আয়: তৈরি পোশাক (RMG) খাতের সম্প্রসারণ ঘটে এবং প্রবাসী শ্রমিকদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রার (Remittance) প্রবাহ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

  • টেলিযোগাযোগ খাত: মোবাইল টেলিফোনি খাতের ওপর থেকে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও উচ্চ শুল্ক তুলে নেওয়া হয়, যার ফলে মোবাইল ফোন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায় এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিপ্লবের সূচনা হয়।

  • অবকাঠামো ও জ্বালানি: গ্রামীণ রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ খাত সম্প্রসারণের প্রাথমিক কাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়।

  • দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক): পুরোনো ব্যুরো অব অ্যান্টি-করাপশন বিলুপ্ত করে ২০০৪ সালে স্বাধীন ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’ গঠিত হয়।

বিতর্ক, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জঙ্গিবাদ

উন্নয়নমূলক অর্জনের পাশাপাশি ২০০১–২০০৬ মেয়াদটি একাধিক গুরুতর বিতর্ক ও রাজনৈতিক সহিংসতায় আচ্ছন্ন ছিল:

  1. সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা (২০০১): ২০০১ সালের নির্বাচনের পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সনাতন ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, যা আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়।

  2. অপারেশন ক্লিন হার্ট (২০০২–২০০৩): দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি সামাল দিতে ২০০২ সালের অক্টোবরে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ পরিচালনা করা হয়। এতে অনেক তালিকাভুক্ত অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে এই অভিযানের সময় সংঘটিত কর্মকাণ্ডকে আইনি দায়মুক্তি (Indemnity) দিয়ে সংসদে আইন পাস করা হয়।

  3. জঙ্গিবাদের উত্থান ও মোকাবিলা:

    • ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ‘জমাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ’ (JMB) দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে প্রায় ৫০০ স্থানে সিরিজ বোমা হামলা চালায়।

    • শুরুতে বিষয়টি অস্বীকারের অভিযোগ উঠলেও পরবর্তীতে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। প্রধান জঙ্গি নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইকে গ্রেপ্তার করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

  4. ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা (২০০৪): ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় এক বিভীষিকাময় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এবং শেখ হাসিনাসহ শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন।

    • এই ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিশনের জজ মিয়া নাটক ও তদন্তের পথ পরিবর্তন করার চেষ্টা বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে চরম রাজনৈতিক ও আইনি দায় হিসেবে উপস্থিত হয়। পরবর্তীতে এই মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ অনেকের বিরুদ্ধে বিচারিক সিদ্ধান্ত আসে।

  5. বিকল্প শক্তি কেন্দ্র ও হাওয়া ভবন: খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের ব্যবহৃত অফিস ‘হাওয়া ভবন’ সমান্তরাল ক্ষমতা কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয় বলে অভিযোগ ওঠে। সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এর প্রভাব নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

২০০৬ সালের ক্ষমতার হস্তান্তর সংকট

২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপি সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হয়। তবে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন—তা নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী দল আওয়ামী লীগের মধ্যে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়।

  • সংবিধানের সংশোধনী ও বয়সের সীমা: বিএনপি সরকার সংবিধান সংশোধন করে বিচারকদের অবসরের বয়সকাল ৬৫ থেকে ৬৭ বছর করায় সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার যোগ্য হন, যাকে আওয়ামী লীগ বিএনপির দলীয় লোক হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে।

  • রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ: দেশের সহিংসতার প্রেক্ষাপটে কে এম হাসান রাজি না হওয়ায়, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজের পদে বহাল থেকেই অতিরিক্ত হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

  • রাজনৈতিক সংঘাত: এই সিদ্ধান্তকে বিরোধী জোট মেনে নেয়নি। রাজপথে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, লগি-বৈঠার আন্দোলন, লাগাতা অবরোধ ও হরতালে পুরো দেশ অচল হয়ে পড়ে।

নবম অধ্যায়: ২০০৭–২০০৮ সালের জরুরি অবস্থা ও রাজনৈতিক সংকট

‘এক-এগারো’ (১/১১) ও সেনাসমর্থিত সরকারের আগমন

রাজনৈতিক সংঘাত ও অচলাবস্থার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এই ঘটনা বাংলাদেশে ‘১/১১’ (এক-এগারো) নামে পরিচিত।

  • ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

  • ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, যার নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মঈন উ আহমদ।

  • নির্ধারিত নির্বাচন স্থগিত করা হয় এবং রাজনীতি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

   ২০০৭-২০০৮ রাজনৈতিক সংকট ও মাইনাস-টু ফর্মুলা:
   ──────────────────────────────────────────
   [রাজনৈতিক সংকট] ➔ [১১ জানুয়ারি: জরুরি অবস্থা জারি]
                          │
                          ▼
            [ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকার]
                          │
         ┌────────────────┴────────────────┐
         ▼                                 ▼
   [মাইনাস-টু ফর্মুলা]             [দুর্নীতিবিরোধী অভিযান]
   (দুই নেত্রীকে বহিষ্কার/দেশত্যাগ)   (শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার)

‘মাইনাস-টু’ ফর্মুলা ও খালেদা জিয়ার অবস্থান

সেনাসমর্থিত সরকার বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে দুই প্রধান নেত্রী—শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়ার একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা হাতে নেয়, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘মাইনাস-টু ফর্মুলা’ (Minus-Two Formula) নামে পরিচিত।

  • খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জোর প্রচেষ্টা চালানো হয়, কিন্তু তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তিনি কোনো অবস্থাতেই দেশ ত্যাগ করবেন না।

  • বিএনপির অভ্যন্তরীণ একটি অংশকে দিয়ে (আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে) দল সংস্কারের নামে খালেদা জিয়াকে বিএনপি থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালানো হয়।

গ্রেপ্তার ও কারাবাস (২০০৭–২০০৮)

২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বেগম খালেদা জিয়াকে তাঁর ঢাকা সেনানিবাসের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

  • তাঁকে সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ কারাগারে (সাব-জেল) দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় বন্দি রাখা হয়।

  • বন্দি থাকা অবস্থাতেই তাঁর বিরুদ্ধে ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ ও ‘গ্যাটকো’সহ একাধিক দুর্নীতি মামলা দায়ের করা হয়।

কারাগারে থাকা সত্ত্বেও খালেদা জিয়া নতি স্বীকার না করে দলের অনুগত অংশকে সংগঠিত রাখেন এবং সেনাসমর্থিত সরকারের অধীনে যেকোনো অনৈতিক রাজনৈতিক সংস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্ত হন।

দশম অধ্যায়: ২০০৯ সালের পর বিরোধী রাজনীতি

২০০৮ সালের নির্বাচন ও ক্ষমতার রদবদল

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়।

  • নির্বাচনী ফলাফল: শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৩০টি আসন লাভ করে বিশাল জয় অর্জন করে। অন্যদিকে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট লাভ করে মাত্র ৩২টি আসন (বিএনপি এককভাবে ৩০টি)।

  • ফলাফল গ্রহণ ও প্রতিক্রিয়া: বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেন, তবে নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন।

সেনানিবাসের বাড়ি ত্যাগ (২০১০)

২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর বেগম খালেদা জিয়াকে তাঁর মইনুল রোডের ঐতিহাসিক সেনানিবাসের বাড়িটি ত্যাগ করতে হয়। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করা এই বাড়িটি থেকে তাঁকে উচ্ছেদ করা নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সরকার আইনি প্রক্রিয়ার কথা বললেও বিএনপি বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে অভিহিত করে। এই ঘটনা খালেদা জিয়া ও সরকারের মধ্যবর্তী সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপ ও নির্বাচন বর্জন (২০১১–২০১৪)

২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনীর পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ বিলুপ্ত করে।

  1. ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন: বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো দাবি জানায় যে, নিরপেক্ষ দলীয় সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এই দাবির মুখে তৎকালীন সরকার দলীয় সরকারের অধীনেই ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করে।

  2. ২০১৫ সালের অবরোধ ও সহিংসতা: ২০১৫ সালের শুরুতেই খালেদা জিয়াকে তাঁর গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করা হলে দলীয় আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেশব্যাপী লাগাতার অবরোধ ঘোষণা করা হয়। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক পেট্রোল বোমা হামলা, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যার দায় উভয় দলই একে অপরের ওপর চাপায়।

২০১৮ সালের নির্বাচন ও ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেসময়ে খালেদা জিয়া কারাগারে বন্দি থাকা সত্ত্বেও, বিএনপি প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে অন্যান্য বিরোধী দলগুলোকে সাথে নিয়ে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ গঠন করে নির্বাচনে অংশ নেয়।

তবে এই নির্বাচন কেন্দ্র করে ‘রাতের ভোট’ এবং নজিরবিহীন কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এ নির্বাচনে মাত্র ৮টি আসন লাভ করে।

একাদশ অধ্যায়: মামলা, কারাবাস ও আইনি লড়াই

জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সেনা সমর্থিত সরকার এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৩৭টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে প্রধান দুটি দুর্নীতি মামলা হলো:

  1. জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা:

    • অভিযোগ: ট্রাস্টের জন্য বিদেশ থেকে প্রাপ্ত ২ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ।

    • রায় (২০১৮): ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার বিশেষ আদালত খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পরবর্তীতে ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করে।

  2. জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা:

    • অভিযোগ: ক্ষমতা অপব্যবহার করে চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা সংগ্রহের অভিযোগ।

    • রায় (২০১৮): ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর একই বিশেষ আদালত তাঁকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে।

নাজিমউদ্দিন রোডের নির্জন কারাবাস ও নির্বাহী আদেশে মুক্তি

দণ্ডাদেশের পর ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে একক বন্দি হিসেবে রাখা হয়। দীর্ঘ নির্জন কারাবাস এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে।

  • নির্বাহী আদেশে মুক্তি (২০২০): কোভিড-১৯ মহামারী প্রেক্ষাপটে এবং স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি হওয়ায়, পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতির অনুকম্পায় তৎকালীন সরকার ২০২০ সালের ২৫ মার্চ ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারায় তাঁর সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়।

  • শর্তাবলী: তিনি তাঁর গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় অবস্থান করবেন এবং বিদেশে যেতে পারবেন না। এই শর্তাধীন মুক্তির মেয়াদ প্রতি ৬ মাস পর পর বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং আইনি দায় থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।

  • রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞাপন (২০২৪): ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট মহামান্য রাষ্ট্রপতি তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে বেগম খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও খালাস প্রদান করেন।

  • আদালতের চূড়ান্ত খালাস (২০২৪–২০২৫): পরবর্তীতে উচ্চ আদালত এবং আপিল বিভাগ পুনর্বিবেচনা ও আপিল শুনানির মাধ্যমে ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’, ‘জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’, ‘নাইকো দুর্নীতি মামলা’ এবং অন্যান্য সমস্ত রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা বাতিল ও খারিজ করে খালেদা জিয়াকে সব সাজা ও মামলা থেকে চূড়ান্তভাবে খালাস প্রদান করে।

দ্বাদশ অধ্যায়: স্বাস্থ্য, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমা

শারীরিক অসুস্থতা ও উন্নত চিকিৎসা

দীর্ঘ কারাবাস এবং বার্ধক্যজনিত কারণে খালেদা জিয়া লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও কিডনির জটিলতায় আক্রান্ত হন। তাঁর পরিবার ও বিএনপি দল থেকে একাধিকবার তাঁকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার আবেদন জানানো হলেও তা রাজনৈতিক জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় আটকে ছিল। মুক্ত হওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়।

পারিবারিক স্বজনহারা ও উত্তরাধিকার

  • পুত্রশোক (২০১৫): ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকো মালয়েশিয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনা তাঁর ব্যক্তিগত ও মানসিক জীবনে এক গভীর আঘাত হানে।

  • রাজনৈতিক উত্তরাধিকার: তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান দীর্ঘদিন লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করলেও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলীয় দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। বর্তমানে বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতি খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের যৌথ ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার দ্বারা পরিচালিত।

ত্রয়োদশ অধ্যায়: অর্থনীতি, উন্নয়ন ও সামাজিক নীতির মূল্যায়ন

বেগম খালেদা জিয়ার দুই প্রধানমন্ত্রিত্বের (১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬) অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি পর্যালোচনা করলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে:

ক্ষেত্র অর্জন ও ইতিবাচক দিক সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা
অর্থনীতি ও রাজস্ব

• ভ্যাট (VAT) প্রবর্তন ও রাজস্ব বৃদ্ধি।

 

• মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি।

• শেষ মেয়াদে চাল, ডাল ও নিত্যপণ্যের বাজারে মূল্যস্ফীতি।

 

• ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জ।

নারী ও মানব উন্নয়ন

• নারী শিক্ষার প্রসার ও বালিকা উপবৃত্তি চালু।

 

• পল্লী অঞ্চলে শিক্ষার হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি।

• গুণগত শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থানের সমন্বয়ে ঘাটতি।
অবকাঠামো ও প্রযুক্তি

• মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর শুল্ক হ্রাস ও ডিজিটালাইজেশন।

 

• যমুনা সেতু সমাপ্তকরণ ও জাতীয় গ্রিড জোরদার।

• বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পোৎপাদনে বাধা।

 

• রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে অবকাঠামোগত প্রকল্পে ধীরগতি।

সুশাসন ও দুর্নীতি • দুদক (ACC) আইন প্রবর্তন (২০০৪)।

• ‘হাওয়া ভবন’ কেন্দ্রিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ।

 

• আন্তর্জাতিক সূচকে দুর্নীতির শীর্ষস্থানে থাকার ইতিহাস।

চতুর্দশ অধ্যায়: নেতৃত্ব, দলীয় রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান

নেতৃত্বের কৌশল ও ব্যক্তিত্ব

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের মূল ভিত্তি ছিল তাঁর দৃঢ়তা, নেতাকর্মীদের আবেগ অনুভূতির সাথে একাত্মতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে আপসহীন মনোভাব। ১৯৮২ সালের পর এক ভাঙনপ্রবণ দলকে সুসংগঠিত করে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার স্বাক্ষর বহন করে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব

  • সংসদীয় ব্যবস্থা: ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা চিরস্মরণীয়।

  • দলীয় কেন্দ্রীকরণ: বিএনপি নীতিগতভাবে জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাস করলেও, বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে দলীয় নেতৃত্ব অনেকাংশেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও পারিবারিক কাঠামোর ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে, যা অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রচর্চাকে কিছুটা সংকুচিত করে।

পঞ্চদশ অধ্যায়: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন এক চরিত্র, যাঁকে এড়িয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা করা অসম্ভব।

সমর্থক ও জাতীয়তাবাদীদের দৃষ্টিতে

বিএনপি ও তাঁর সমর্থকদের দৃষ্টিতে তিনি ‘দেশনেত্রী’ ও ‘গণতন্ত্রের মাতা’। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি রক্ষা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রতিষ্ঠা এবং নারীদের সামাজিক ক্ষমতায়নে তাঁর ভূমিকা চিরভাস্বর।

সমালোচকদের দৃষ্টিতে

সমালোচক ও বিরোধীদের মতে, ২০০১–২০০৬ সালের মেয়াদে রাজনৈতিক সহিংসতা রোধে ব্যর্থতা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সুষ্ঠু তদন্তের অভাব, এবং ডানপন্থী রাজনৈতিক জোটে জামায়াতে ইসলামীকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছিল।

ঐতিহাসিক স্থান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কাচঘেরা ঘরের সীমা ভেঙে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল নজির স্থাপন করেছিলেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি যে জীবনসংগ্রাম অতিক্রম করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপসহীনতার প্রতীক হিসেবে থেকে যাবে।

খালেদা জিয়ার জীবনপঞ্জি (Chronology)

  • ১৯৪৫ (১৫ আগস্ট): জন্ম লাভ করেন।

  • ১৯৬০ (আগস্ট): ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

  • ১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধে বন্দী জীবনের মুখোমুখি হন।

  • ১৯৮১ (৩০ মে): রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড।

  • ১৯৮২ (৩ জানুয়ারি): রাজনীতিতে অভিষেক ও বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ।

  • ১৯৮৪ (মার্চ): বিএনপি চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।

  • ১৯৯০ (ডিসেম্বর): এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সফল সমাপ্তি ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার।

  • ১৯৯১ (২০ মার্চ): প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ।

  • ১৯৯১ (৬ আগস্ট): সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার ঐতিহাসিক দ্বাদশ সংশোধনী পাস।

  • ১৯৯৬ (মার্চ): অসাংবিধানিক চাপ মোকাবিলা করে সংবিধানে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা সংযোজন ও পদত্যাগ।

  • ১৯৯৯: চারদলীয় জোট গঠন।

  • ২০০১ (১০ অক্টোবর): দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার্যভার গ্রহণ।

  • ২০০৭ (৩ সেপ্টেম্বর): ১/১১ সরকারের আমলে গ্রেপ্তার ও কারাবরণ।

  • ২০১৮ (৮ ফেব্রুয়ারি): বিশেষ আদালতের সজ্জায় নাজিমউদ্দিন রোড কারাগারে স্থানান্তর।

  • ২০২০ (২৫ মার্চ): শারীরিক কারণে শর্তসাপেক্ষে নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি।

  • ২০২৪ (৬ আগস্ট): গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্রপতি প্রজ্ঞাপনে নিঃশর্ত মুক্তি।

  • ২০২৪–২০২৫: উচ্চ আদালত ও আপিল বিভাগ থেকে সকল সাজা বাতিল ও সকল মামলা থেকে চূড়ান্ত আইনি খালাস লাভ।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১. আহমেদ, মওদুদ। বাংলাদেশের গণতন্ত্র: ১৯৯১ থেকে ২০০৬। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (UPL)।

২. রশীদ, হারুন-অর। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস। বাংলা একাডেমি।

৩. নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ (ECB)। জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিবেদনসমূহ (১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮)।

৪. আইন ও বিচার বিভাগ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের নথি এবং গেজেট (২০১৮–২০২৫)।

৫. জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রের আর্কাইভ: দৈনিক প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) (১৯৯১–২০২৬)।

৬. আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও আর্কাইভ: BBC Bengali, Reuters, AFP।

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Keep Up to Date with the Most Important News

By pressing the Subscribe button, you confirm that you have read and are agreeing to our Privacy Policy and Terms of Use
Press Nation Bangladesh