শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন, সংগ্রাম, রাষ্ট্র ও ইতিহাসের বিচার

Kk 1773720709 Kk 1773720709
Kk 1773720709

পূর্ণাঙ্গ সূচিপত্র (Table of Contents)

  • ১. মুখবন্ধ ও গবেষণার রূপরেখা
  • ২. অধ্যায় ১: শৈশব, পরিবার, বংশপরিচয় ও কিশোর জীবনের বিকাশ (১৯২০–১৯৩৮)
  • ৩. অধ্যায় ২: ব্রিটিশ ভারত, মুসলিম লীগ ও প্রাথমিক রাজনৈতিক অঙ্গন (১৯৩৮–১৯৪৭)
  • ৪. অধ্যায় ৩: ভাষা আন্দোলন ও পূর্ব বাংলার রাজনীতির নতুন মোড় (১৯৪৮–১৯৫৩)
  • ৫. অধ্যায় ৪: যুক্তফ্রন্ট, সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক সংঘাত (১৯৫৪–১৯৬৫)
  • ৬. অধ্যায় ৫: ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান (১৯৬৬–১৯৬৯)
  • ৭. অধ্যায় ৬: ১৯৭০ সালের নির্বাচন, অসহযোগ আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের সূচনা (১৯৭০–১৯৭১)
  • ৮. অধ্যায় ৭: পাকিস্তানের বন্দিজীবন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন
  • ৯. অধ্যায় ৮: রাষ্ট্র পরিচালনা, সংবিধান প্রণয়ন ও যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন (১৯৭২–১৯৭৩)
  • ১০. অধ্যায় ৯: ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
  • ১১. অধ্যায় ১০: বাকশাল, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও গণতন্ত্রের সংকট (১৯৭৪–১৯৭৫)
  • ১২. অধ্যায় ১১: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫: হত্যাকাণ্ড, বিচারিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
  • ১৩. অধ্যায় ১২: ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও মানবিক দিক
  • ১৪. অধ্যায় ১৩: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি ও শীতল যুদ্ধকালীন রাজনীতি
  • ১৫. অধ্যায় ১৪: ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, মূল্যায়ন ও বিতর্ক
  • ১৬. গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও অমীমাংসিত প্রশ্ন
  • ১৭. গ্রন্থপঞ্জি ও প্রধান উৎসসমূহ

ভূমিকা ও প্রথম অধ্যায়ের সূচনা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার উত্থান-পতনের ইতিহাস নয়; এটি একটি পরাধীন জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম এবং একটি ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জটিল প্রক্রিয়ার প্রতিচ্ছবি। এই জীবনীতে কোনো ব্যক্তিপূজা বা রাজনৈতিক পক্ষপাত নয়, বরং তাঁর সময়, সমাজ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির আলোকে তাঁর জীবন ও কর্মকে মূল্যায়ন করা হবে।
নিচে এই গবেষণাগ্রন্থের প্রথম অধ্যায় উপস্থাপন করা হলো।

অধ্যায় ১: শৈশব, পরিবার, বংশপরিচয় ও কিশোর জীবনের বিকাশ (১৯২০–১৯৩৮)

১.১ জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে) শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম হয়। তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন একজন খোড়াসানি বংশোদ্ভূত দূরবর্তী পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকারী, যিনি পরবর্তী সময়ে গোপালগঞ্জ দেওয়ানি আদালতের সেরেস্তাদার বা বেঞ্চ ক্লার্ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর মাতা সায়েরা খাতুন ছিলেন প্রগতিশীল ও ধার্মিক মনের নারী।
পারিবারিক অবস্থান ও বংশপরিচয়ের দিক থেকে শেখ পরিবার টুঙ্গিপাড়ার অন্যতম প্রভাবশালী ও অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল পরিবার ছিল। পৈতৃক সূত্রে তারা মাঝারি ধরনের ভূমির মালিক (জোতদার শ্রেণি) ছিলেন, যা সেকালের গ্রামীণ সমাজে তাদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করেছিল। তবে এই সচ্ছলতা কোনো অভিজাত বা জমিদারসুলভ বিলাসিতা ছিল না; বরং এটি ছিল মধ্যবিত্ত গ্রামীণ সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে গঠিত একটি সুদৃঢ় ভিত্তি।

১.২ গোপালগঞ্জের সামাজিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা

তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমা ছিল নদীমাতৃক এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এক জনপদ। মধুমতি ও বাইগার নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এই অঞ্চলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস ছিল। গ্রামীণ সমাজে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য স্পষ্টভাবে বিদ্যমান ছিল—যেখানে ভূমির বড় অংশ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের হাতে ছিল, আর সাধারণ মুসলমানরা প্রধানত কৃষক ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই সামাজিক বৈষম্য এবং ধর্মীয় মেরুকরণের প্রাথমিক প্রভাব কিশোর মুজিবের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। তাঁর আত্মজীবনী ও সমসাময়িক বিবরণে গ্রামীণ বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, নদীভাঙন এবং গ্রামীণ রাজনীতির নানা রূপ ফুটে উঠেছে।

১.৩ শিক্ষাজীবন ও ছাত্রাবস্থার অভিজ্ঞতা

শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় টুঙ্গিপাড়ার গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর তিনি মাদারীপুর ইসলামিয়া হাই স্কুল এবং গোপালগঞ্জ মিশন হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। তাঁর ছাত্রজীবন খুব মসৃণ ছিল না। কৈশোরে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তাঁর চোখের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাঁকে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা থেকে দূরে থাকতে হয়। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমান মওলানা আজাদ কলেজ) থেকে তিনি আইএ এবং পরবর্তীতে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন।
কিশোর বয়সেই তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক দায়বোধের পরিচয় পাওয়া যায়। স্কুলের ছাত্রাবস্থায় তিনি গরিব ছাত্রদের সাহায্যার্থে তহবিল গঠন, স্কুল পরিদর্শনে আসা ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সামনে সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিবাদ জানানো এবং স্থানীয় সামাজিক কাজে অংশ নেন। মাদারীপুরে পড়াশোনা করার সময় বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতা ও সমাজসংস্কারক মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের সংস্পর্শে আসার সুযোগ ঘটে, যা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার পরিসরকে প্রসারিত করে।

১.৪ কিশোর বয়সের রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনা

শেখ মুজিবের রাজনৈতিক সচেতনতা আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মতো নেতাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৯৩৮ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ সফরে এলে তরুণ শেখ মুজিব তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় মুগ্ধ হন। এই সাক্ষাৎই তাঁর পরবর্তী জীবনের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।
পরিবার, স্থানীয় সমাজ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বাস্তবতার মধ্য দিয়েই শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিত্বের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। এটি ছিল এমন এক সময়, যখন উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
পরবর্তী অংশের জন্য নির্দেশনা: প্রথম অধ্যায়ের পর ক্রমানুসারে পরবর্তী অধ্যায়গুলো (ব্রিটিশ ভারত, মুসলিম লীগ ও প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবন; ভাষা আন্দোলন; যুক্তফ্রন্ট ইত্যাদি) বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হবে।

অধ্যায় ২: ব্রিটিশ ভারত, মুসলিম লীগ ও প্রাথমিক রাজনৈতিক অঙ্গন (১৯৩৮–১৯৪৭)

২.১ ১৯৩০-এর দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলার রাজনীতি

১৯৩০-এর দশকের শেষভাগে বঙ্গপ্রদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তাল ও জটিল। ১৯৩৫ সালের ‘ভারত শাসন আইন’ (Government of India Act 1935)-এর অধীনে ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচন বাংলা তথা গোটা উপদ্বীপে এক নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করে। এই নির্বাচনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ (KPP) এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়। অখণ্ড বাংলায় মুসলিম মধ্যবিত্ত ও কৃষক সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের তাগিদ থেকে প্রজা আন্দোলন ও মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই কিশোর শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতিতে হাতেখড়ি। গোপালগঞ্জ মিশন হাই স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৩৮ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ সফরে আসেন। তরুণ শেখ মুজিব সেখানে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্ব দেন এবং সাহসিকতার সঙ্গে স্কুলের ছাদ মেরামতের দাবি উত্থাপন করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তরুণ মুজিবের সাংগঠনিক দক্ষতা ও আত্মপ্রত্যয় দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁর যোগাযোগের ঠিকানা রেখে যান। এই প্রথম সাক্ষাৎ পরবর্তীতে শেখ মুজিবের রাজনীতিতে প্রবেশ ও অগ্রগতির প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

২.২ কলকাতায় ছাত্ররাজনীতি ও নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ

১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিকুলেশন) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় গমন করেন। তিনি বিখ্যাত ‘ইসলামিয়া কলেজ’ (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ)-এ ভর্তি হন এবং বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষে বসবাস শুরু করেন।
কলকাতা সে সময় ছিল অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক কেন্দ্র। ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হওয়ার পরই তিনি নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ (All Bengal Muslim Students’ League)-এর রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী বা ‘সোহরাওয়ার্দী গোষ্ঠী’র একজন প্রধান তরুণ সংগঠকে পরিণত হন। ১৯৪৩ সালে তিনি নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের প্রদেয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৪৬ সালে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
[ইসলামিয়া কলেজ (১৯৪২-১৯৪৭)]
         │
         ├── নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ কাউন্সিলর (১৯৪৩)
         ├── ১৯৪৩-এর মহাদুর্ভিক্ষে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় সরাসরি অংশগ্রহণ
         └── ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদ (জিএস, ১৯৪৬)

২.৩ ১৯৪৩-এর মহাদুর্ভিক্ষ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলায় সৃষ্ট ভয়াবহ কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে (যা ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত) প্রায় ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এ সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে মানবিক ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে শেখ মুজিব নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করেন।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশনায় তিনি ইসলামিয়া কলেজ ও বেকার হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে লंगरখানা (Relief Kitchen) পরিচালনা করেন, ভুখা মিছিল বের করেন এবং দুর্গত মানুষের মধ্যে খাদ্য বিতরণের ব্যবস্থা করেন। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-তে তিনি এই সময়ের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন, যা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় শোষিত ও অনাহারী মানুষের অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতে শেখায়।

২.৪ পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৪৬-এর সাধারণ নির্বাচন ও ক্যাবিনেট মিশন

১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের পর নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ‘পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র’ বা ‘পাকিস্তান’-এর দাবিতে আন্দোলন জোরদার করে। শেখ মুজিবুর রহমান এই আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ মাঠপর্যায়ের কর্মী হিসেবে কাজ করেন।
১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থীরা অখণ্ড বাংলায় অভাবনীয় জয়লাভ করেন। এই নির্বাচনে শেখ মুজিব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে ফরিদপুর অঞ্চলে ব্যাপকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালান। তিনি গ্রামীণ জনপদে ঘুরে ঘুরে কৃষক ও সাধারণ মানুষের কাছে লাহোর প্রস্তাবের মূল বক্তব্য পৌছে দেন।
তবে ঐতিহাসিক দলিল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান কেবল ধর্মীয় আবেগ থেকে পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করেননি; তাঁর দৃষ্টিতে এটি ছিল তৎকালীন বাংলার জমিদারি প্রথা, মহাজনী শোষণ এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সামাজিক-অর্থনৈতিক আধিপত্য থেকে বাঙালি মুসলমানদের মুক্তির আন্দোলন।

২.৫ ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ (১৯৪৬) ও হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা প্রতিহতকরণ

১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ কর্তৃক আহূত ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ (Direct Action Day)-কে কেন্দ্র করে কলকাতায় অভূতপূর্ব এবং ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রকাটিত হয়, যা ইতিহাসে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে পরিচিত।
দাঙ্গার সময় শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর ছাত্র সহকর্মীরা অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে জীবন বাজি রেখে কাজ করেন। ঐতিহাসিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, শেখ মুজিব এই দাঙ্গার সময় কেবল মুসলমানদের আত্মরক্ষা নয়, বরং অসংখ্য বিপদাপন্ন হিন্দু পরিবারকেও উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। তিনি বেকার হোস্টেলকে ত্রাণ ও চিকিৎসা কেন্দ্রে রূপান্তর করতে ভূমিকা রাখেন।

২.৬ ‘অখণ্ড স্বাধীন বাংলা’ প্রস্তাব ও ১৯৪৭-এর দেশভাগ

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভাগ যখন নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির রাজনৈতিক অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎচন্দ্র বসু এবং কিরণশঙ্কর রায় এক যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যা ‘অখণ্ড স্বাধীন বাংলা’ (United Independent Bengal) প্রস্তাব নামে পরিচিত।
শেখ মুজিবুর রহমান এই অখণ্ড বাংলার ধারণাকে পূর্ণ সমর্থন জানান এবং আবুল হাশিম ও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মিলে এই দাবির পক্ষে প্রচার চালান। তাঁদের স্বপ্ন ছিল—পাকিস্তান বা ভারতের অধীনে না গিয়ে বাংলা হবে একটি স্বাধীন, অসাম্প্রদায়িক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তবে নিখিল ভারত কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব (বিশেষ করে সরদার বল্লভভাই প্যাটেল) এবং মুসলিম লীগের উচ্চপর্যায়ের (বিশেষ করে জিন্নাহ ও খাজা নাজিমুদ্দীন গোষ্ঠী) বিরোধিতার কারণে এই প্রস্তাব ভেস্তে যায়।
রাজনৈতিক পক্ষ অখণ্ড বাংলা প্রস্তাবের প্রতি অবস্থান
সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম গ্রুপ (শেখ মুজিবসহ) পূর্ণ সমর্থন; অসাম্প্রদায়িক সার্বভৌম বাংলা গঠন
কংগ্রেস কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব (প্যাটেল, নেহেরু) কঠোর বিরোধিতা; বাংলা বিভাজনের দাবি
মুসলিম লীগ (জিন্নাহ-নাজিমুদ্দীন গ্রুপ) বিরোধিতা; জিন্নাহর অনিচ্ছাসত্ত্বিক সমর্থন থাকলেও বাস্তবায়ন অসম্ভব করে তোলা
অবশেষে ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট ধর্মভিত্তিক দেশভাগের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং বঙ্গপ্রদেশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে পূর্ব বাংলা (East Bengal) পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৪৭ সালের আগস্টে শেখ মুজিব কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে পূর্ব বাংলার রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেন।

অধ্যায় ৩: ভাষা আন্দোলন ও পূর্ব বাংলার রাজনীতির নতুন মোড় (১৯৪৮–১৯৫৩)

৩.১ ১৯৪৭ পরবর্তী মোহভঙ্গ ও তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক স্থবিরতা

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের জন্ম হলেও পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা দ্রুত হতাশায় রূপ নেয়। প্রশাসনিক পদে পশ্চিম পাকিস্তানি আমলাদের প্রাধান্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন পূর্ব বাংলার জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। খাজা নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব বাংলার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও ভাষার দাবিকে উপেক্ষা করতে শুরু করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরপরই শেখ মুজিবুর রহমান অনুভব করেন যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোতে বাঙালিদের অধিকার আদায়ের জন্য মুসলিম লীগের বিকল্প রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন প্রয়োজন।

৩.২ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন (১৯৪৮)

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত এক সভায় শেখ মুজিবুর রহমান, নইমুদ্দিন আহমেদ, ওলি আহাদ প্রমুখের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ (পরবর্তীতে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’)। এটি ছিল পাকিস্তান আমলের প্রথম বিরোধী রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন। শেখ মুজিব প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে অন্যতম প্রধান সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন।

৩.৩ ১৯৪৮ সালের প্রাথমিক ভাষা আন্দোলন ও গ্রেপ্তার

১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান, যা খাজা নাজিমুদ্দীন ও কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যাখ্যান করে। এর প্রতিবাদে ঢাকায় তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়।
২ মার্চ ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। শেখ মুজিব এই পরিষদ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। সংগ্রাম পরিষদ ১১ মার্চ ১৯৪৮ সারা পূর্ব পাকিস্তানে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ পালন এবং সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়।
১১ মার্চ সকালে সচিবালয়ের সামনে পিকেটিং করার সময় শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, ওলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুবসহ বহু ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার হন। এটিই ছিল পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম কারাবরণ। তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৫ মার্চ মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন বন্দী নেতাদের মুক্তি দিতে এবং ছাত্রদের সঙ্গে ৮ দফা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।
[১১ মার্চ ১৯৪৮: রাষ্ট্রভাষা ধর্মঘট] ──> [শেখ মুজিবসহ নেতাদের গ্রেপ্তার] ──> [১৫ মার্চ: ৮-দফা চুক্তি ও মুক্তি]

৩.৪ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলন ও বহিষ্কার

১৯৪৯ সালের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা বেতন বৃদ্ধি ও আবাসন সুবিধার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর ছাত্রলীগ সহকর্মীরা কর্মচারীদের নীতিগত দাবি সমর্থন করে আন্দোলনে যোগ দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্মচারীদের দাবি মেনে না নিয়ে আন্দোলনকারী ছাত্র নেতাদের জরিপানা ও মুচলেকা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। শেখ মুজিবুর রহমান অন্যায় আদেশ মেনে মুচলেকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে ১৯৪৯ সালের এপ্রিলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে। পরবর্তীতে তিনি কোনোদিন এই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেননি (২০১০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই অন্যায্য বহিষ্কারাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে)।

৩.৫ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা (১৯৪৯)

মুসলিম লীগের রক্ষণশীল ও গণবিরোধী রাজনীতির বিকল্প হিসেবে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কেএম দাস লেনের ঐতিহাসিক ‘রোজ গার্ডেন’-এ মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’।
প্রতিষ্ঠাকালে আতাউর রহমান খান সহ-সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় ২৯ বছর বয়সী শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে শেখ মুজিব ছাত্ররাজনীতি থেকে মূলধারার জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্ব (২৩ জুন ১৯৪৯):
├── সভাপতি: মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী
├── সাধারণ সম্পাদক: শামসুল হক
└── যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক: শেখ মুজিবুর রহমান (বন্দী অবস্থায় নির্বাচিত)

৩.৬ ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিবের ভূমিকা

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী চেতনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তা বন্দী হিসেবে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিনি রাজনৈতিক সহকর্মী ও ছাত্রনেতাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ বজায় রাখেন।
জানুয়ারি ১৯৫২-এ খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকায় অল পাকিস্তান মুসলিম লীগের সম্মেলনে ঘোষণা করেন, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” এর প্রতিবাদে আন্দোলন আবার নতুন রূপ নেয়।
১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ থেকে শেখ মুজিব এবং তাঁর সহবন্দী মহিউদ্দিন আহমেদ রাজবন্দীদের মুক্তি এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে কারাগারে আমরণ অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়, সেখানেও তিনি অনশন অব্যাহত রাখেন।
২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। অনশনের কারণে শেখ মুজিবের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং গণ-আন্দোলনের চাপে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সরকার।
তথ্যসূত্র ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির প্রত্যক্ষ রক্তপাতের দিনে শেখ মুজিব কারাগারে থাকলেও, আন্দোলনের প্রস্তুতি, সর্বদলীয় কৌশল নির্ধারণ এবং অনশন ধর্মঘটের মাধ্যমে আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধিতে তাঁর ভূমিকা সমসাময়িক সংবাদপত্র এবং গোয়েন্দা নথি (Secret Documents of Intelligence Branch on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman) দ্বারা প্রমাণিত।

৩.৭ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন (১৯৫৩)

১৯৫৩ সালের ৯-১১ জুলাই ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর আগে দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললে শেখ মুজিব ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ মুজিব পুরো পূর্ব বাংলা চষে বেড়ান এবং তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগকে একটি শক্তিশালী, গণমুখী ও সর্বব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেন।

অধ্যায় ৪: যুক্তফ্রন্ট, সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক সংঘাত (১৯৫৪–১৯ ১৯৬৫)

৪.১ ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও ঐতিহাসিক বিজয়

১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথম সার্বজনীন ভোটাধিকারভিত্তিক নির্বাচন। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষ্যে প্রধান বিরোধী দলগুলো নিয়ে গঠিত হয় ‘যুক্তফ্রন্ট’।
যুক্তফ্রন্টের প্রধান চার দল ও নেতা:
  1. আওয়ামী মুসলিম লীগ – মাওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান
  2. কৃষক শ্রমিক পার্টি (KSP) – শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক
  3. নেজামে ইসলাম – মাওলানা আতাহার আলী
  4. গণতন্ত্রী দল – হাজী মোহাম্মদ দানেশ
যুক্তফ্রন্ট ‘২১ দফা’ কর্মসূচির ভিত্তিতে নির্বাচন পরিচালনা করে। ২১ দফার মধ্যে প্রধান দাবি ছিল বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা, পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন, জমিদার প্রথা উচ্ছেদ এবং পাট ব্যবসা জাতীয়করণ।
elections-এর ফলাফলে ৩০৯টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন লাভ করে ঐতিহাসিক ধস নামানো বিজয় অর্জন করে, যেখানে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসন পায়। শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।
[১৯৫৪ প্রাদেশিক নির্বাচন]
         │
         ├── যুক্তফ্রন্ট: ২২৩ আসন (বিপুল বিজয়)
         └── মুসলিম লীগ: ৯ আসন (চূড়ান্ত পরাজয়)

৪.২ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ও আদমজী দাঙ্গা: ৯২-ক ধারা জারি

১৯৫৪ সালের মে মাসে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে কৃষি, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তবে সরকার গঠনের মাত্র ১৫ দিনের মাথায় নারায়ণগঞ্জের আদমজী পাটকলে বাঙালি ও অ-বাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গা সংঘটিত হয়। কেন্দ্রীয় সরকার এই দাঙ্গার দায় যুক্তফ্রন্ট সরকারের ওপর চাপায়। ৩০ মে ১৯৫৪ সালে করাচির কেন্দ্রীয় সরকার ৯২-ক (Section 92A) ধারা জারি করে প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা বরখাস্ত করে এবং গভর্নরি শাসন চালু করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

৪.৩ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির দিকে যাত্রা: ‘আওয়ামী লীগ’ নামকরণ (১৯৫৫)

১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমানের জোরালো উদ্যোগে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ রাখা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল দলের দরজা অমুসলিম নাগরিক (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান)-দের জন্য উন্মুক্ত করা এবং পাকিস্তানকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের দিকে এগিয়ে নেওয়া।

৪.৪ গণপরিষদ সদস্য ও স্বায়ত্তশাসনের শক্ত উচ্চারণ (১৯৫৫–১৯৫৬)

১৯৫৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান দ্বিতীয় পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। গণপরিষদে তিনি পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক শোষণ, বৈষম্য এবং ভাষা সংস্কৃতির ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য রাখেন।
১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট গণপরিষদে ‘এক ইউনিট’ (One Unit) বিল আলোচনার সময় শেখ মুজিব বলেন:
“স্যার, আপনি দেখবেন ওরা ‘পূর্ব বাংলা’ শব্দটিকে পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখতে চায়। আমরা বারবার দাবি জানিয়েছি যে, আপনাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব মেনে নিতে হবে। আপনারা জনগণের সম্মতি ছাড়া এই নাম পরিবর্তন করতে পারেন না…”
১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনরায় প্রাদেশিক সরকার গঠন করলে শেখ মুজিব শিল্প, বাণিজ্য ও শ্রম মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তবে ১৯৫৭ সালে দলীয় সংগঠনকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে তিনি স্বেচ্ছায় মন্ত্রিত্ব পদ ত্যাগ করেন—যা রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

৪.৫ ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক নিপীড়ন

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সংবিধান স্থগিত করে সামরিক শাসন জারি করেন। এর অল্প কদিন পর ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন।
সামরিক শাসক আইয়ুব খান ‘EBDO’ (Elective Bodies Disqualification Order) জারি করে শেখ মুজিবসহ প্রধান নেতাদের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ও গ্রেপ্তার করেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে বারবার গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা দুর্নীতি ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়।
[১৯৫৮: আইয়ুব খানের সামরিক শাসন] ──> [সংবিধান বাতিল ও রাজনীতি নিষিদ্ধ] ──> [শেখ মুজিবের দীর্ঘ কারাবাস ও নিপীড়ন]

৪.৬ এনডিএফ (NDF) গঠন ও ১৯৬৪ সালের নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহর সমর্থনে প্রচার

১৯৬২ সালে আইয়ুব খান তাঁর তথাকথিত ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ (Basic Democracies) প্রথার অধীনে নতুন সংবিধান চালু করলে রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (NDF) গঠন করে।
১৯৬৪ সালে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দলের (COP) প্রার্থী হিসেবে ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন দিয়ে শেখ মুজিব পূর্ব বাংলায় ব্যাপক প্রচার অভিযান পরিচালনা করেন। যদিও নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করে আইয়ুব খান বিজয়ী হন, কিন্তু শেখ মুজিবের জনসংযোগ ও জনপ্রিয়তাকে আইয়ুব শাহী বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে।

অধ্যায় ৫: ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান (১৯৬৬–১৯৬৯)

৫.১ ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার চরম শূন্যতা এবং পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষ এক তীব্র বিস্ফোরণের মুখে পড়ে। এই ঐতিহাসিক পটভূমিতে ১৯৬৬ সালের ৫–৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা কর্মসূচি’ উত্থাপন করেন। এটিকে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ বা ‘ম্যাগনা কার্টা’ বলা হয়।
ছয় দফার মূল রূপরেখা:
  1. শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও সরকার পদ্ধতি: ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র হতে হবে এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকতে হবে। সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে নির্বাচন হবে।
  2. কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেবল দুটি মাত্র বিষয় থাকবে—প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। বাকি সমস্ত বিভাগ বা বিষয় প্রাদেশিক সরকারের অধীনে থাকবে।
  3. মুদ্রা বা অর্থ সংক্রান্ত নীতি: দেশের দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক অথচ সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা অথবা একটি মাত্র মুদ্রা চালিত থাকবে, তবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে (আলাদা স্টেট ব্যাংক ও রিজার্ভের বিধান)।
  4. রাজস্ব ও কর ধার্যের ক্ষমতা: সকল প্রকার ট্যাক্স, খাজনা বা কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে। কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ের জন্য প্রদেশগুলোর রাজস্বের অংশীদারিত্ব থাকবে।
  5. বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ: দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রার অর্জিত অর্থের পৃথক হিসাব থাকতে হবে এবং প্রদেশগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক সাহায্য চুক্তি করার পূর্ণ অধিকার থাকবে।
  6. আঞ্চলিক সেনাবাহিনী বা আধা-সামরিক বাহিনী গঠন: আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে আধাসামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা থাকতে হবে।

৫.২ ছয় দফার পক্ষে প্রচারণা এবং শেখ মুজিবের দেশব্যাপী গ্রেপ্তার

ছয় দফা ঘোষণার পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও আইয়ুব খান একে ‘পাকিস্তান ভাঙার চক্রান্ত’ হিসেবে অভিহিত করেন। শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফাকে জনগণের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জেলায় ঝড়ো সফর শুরু করেন। সাধারণ শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা এই দাবির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানান।
জনসমর্থন দেখে আতঙ্কিত হয়ে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবের ওপর দমনপীড়ন নামিয়ে আনে। ১৯৬৬ সালের মে থেকে জুনের মধ্যে তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার করা হয় এবং পূর্ব বাংলার বিভিন্ন থানায় তাঁর ও তাঁর সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ডজন ডজন মামলা দায়ের করা হয়। দলের অধিকাংশ শীর্ষ নেতাকে কারাবন্দী করা হলেও যুবলীগ ও ছাত্রসমাজ আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে।

৫.৩ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (১৯৬৮) ও ঐতিহাসিক পটভূমি

আইয়ুব খানের সামরিক সরকার ছয় দফা আন্দোলনকে চিরতরে দমন করার জন্য এক অভিনব ও কঠোর আইনি চক্রান্তের আশ্রয় নেয়। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে যে, শেখ মুজিবুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা ভারতের আগরতলায় বসে পাকিস্তানের অখণ্ডতা ধ্বংসের এক সশস্ত্র ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।
আনুষ্ঠানিক নাম ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ মামলা, যা ইতিহাসে বহুল পরিচিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে। এই মামলায় মোট ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয় এবং শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি (১ নম্বর আসামি) করে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়।
আইনি ও রাজনৈতিক প্রভাব: সরকার চেয়েছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার চিরতরে ধ্বংস করতে কিংবা দেশবাসীর সামনে তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করতে। কিন্তু এর বিপরীত ফল ঘটে। সমগ্র পূর্ব বাংলা এই মামলাকে একটি ‘মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা’ হিসেবে গ্রহণ করে এবং বুঝতে পারে যে এটি পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনকে স্তব্ধ করার গভীর চক্রান্ত।

৫.৪ ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও আসাদ-শামসুজ্জোহা হত্যাকাণ্ড

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রতিবাদে এবং বন্দি শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগণ রাজপথে নেমে আসে। গড়ে ওঠে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ (East Pakistan Students’ Action Council), যারা ১১ দফা কর্মসূচি পেশ করে ছয় দফাকে আরও ব্যাপকভিত্তিক রূপ দেয়।
  • ২০ জানুয়ারি ১৯৬৯: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আদালুর রহমান আসাদ (শহীদ আসাদ) নিহত হন। এই রক্তপাতের মধ্য দিয়ে আন্দোলন চূড়ান্ত গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
  • ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৯: দেশজুড়ে সর্বাত্মক হরতালে পুলিশের গুলিতে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা নিহত হন। রাজশাহীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মুহাম্মদ শামসুজ্জোহা সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হয়ে এক অনন্য আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করেন।
  • ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯: মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হককে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এর ফলে ক্ষুব্ধ জনতা গণভবন ও সরকারি অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়।

৫.৫ আইয়ুব খানের পতন, আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি

পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আইয়ুব খান গোলটেবিল বৈঠক ডাকতে বাধ্য হন এবং ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে সকল বন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দেন।
  • ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯: রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ লক্ষ জনতার এক বিশাল সংবর্ধনা সভায় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে তৎকালীন ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
  • মার্চ ১৯৬৯: আইয়ুব খান ক্ষমতাচ্যুত হন এবং অপর এক সেনাশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণ করে পাকিস্তানে নতুন সামরিক শাসন জারি করেন, তবে একই সঙ্গে ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচন দেওয়ার ঘোষণা দিতে বাধ্য হন।

অধ্যায় ৬: ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও স্বাধীনতার পথে অগ্রযাত্রা (১৯৭০–১৯৭১)

৬.১ ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন: প্রেক্ষাপট ও ফলাফল

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকারের অধীনে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সর্বজনীন প্রত্যক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচন ছিল মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদ বনাম পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক অক্ষের ক্ষমতার লড়াই। আওয়ামী লীগ ছয় দফাকে মূল এজেন্ডা বানিয়ে নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়।
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর পূর্ব বাংলায় আঘাত হানে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস (ভোলা সাইক্লোন), যাতে লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। কেন্দ্রীয় সরকারের চরম ঔদাসীন্য ও অমানবিক আচরণ পূর্ব বাংলার মানুষের মনে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি চূড়ান্ত অনাস্থা তৈরি করে।
নির্বাচনী ফলাফল:
জাতীয় পরিষদের ৩১৩টি আসনের মধ্যে পূর্ব বাংলার জন্য বরাদ্দ ছিল ১৬৯টি আসন। আওয়ামী লীগ এককভাবে ১৬৭টি আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সারা পাকিস্তানে মোট ৩১৩টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান সমগ্র পাকিস্তানের সরকার গঠনের সাংবিধানিক অধিকার লাভ করেন।
[১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচন (পূর্ব বাংলা: ১৬৯ আসন)]
├── আওয়ামী লীগ: ১৬৭ আসন (নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা)
└── অন্যান্য দল: ২ আসন

৬.২ ক্ষমতা হস্তান্তরে চক্রান্ত ও ইয়াহিয়া-ভুট্টোর অক্ষ

নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করেন। ভুট্টো ঘোষণা করেন যে, “সংখ্যাগরিষ্ঠতাই সব নয়, কেন্দ্র বা সরকার চালাতে হলে পশ্চিম পাকিস্তানের সমর্থনও জরুরি।”
জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ১৯৭১ তারিখে ঢাকায় বসতে যাওয়া জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন ১ মার্চ আকস্মিকভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে পূর্ব বাংলায় মুহূর্তের মধ্যে তীব্র দাবানল জ্বেলে ওঠে।

৬.৩ ১৯৭১ সালের ১ থেকে ২৫ মার্চ: অসহযোগ আন্দোলন

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব বাংলার মানুষ শেখ মুজিবের নির্দেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত কার্যত শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশেই পূর্ব বাংলা পরিচালিত হতে থাকে। সরকারি অফিস, আদালত, ব্যাংক, এমন কি সচিবালয় পর্যন্ত তাঁর নির্দেশ মেনে চলত। পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে কালো পতাকা ও বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়।

৬.৪ ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ: পটভূমি ও বিশ্লেষণ

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ভাষণ প্রদান করেন।
ভাষণের মূল বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ:
  • কৌশলগত ভারসাম্য: আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করলে বিশ্বমঞ্চে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বা ‘আগ্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শেখ মুজিব অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে একদিকে সামরিক আইন প্রত্যাহার, সেনা প্রত্যাহার এবং জনতার ওপর হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন, অন্যদিকে “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—এই দ্ব্যর্থহীন ঘোষণার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে স্বাধীনতার চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
  • প্রস্তুতিমূলক বার্তা: “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব—এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো…”—এই অংশটি মূলত একটি পরাধীন জাতিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার চূড়ান্ত মানসিক ও সামরিক নির্দেশ ছিল।

৬.৫ ২৫ মার্চ ১৯৭১: অপারেশন সার্চলাইট ও সামরিক ক্র্যাকডাউন

মাঝের সময়টাতে জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে শেখ মুজিবের দফায় দফায় রাজনৈতিক আলোচনা চললেও তা ছিল কেবল সামরিক শক্তি সঞ্চয়ের একটি প্রতারণামূলক কৌশল (Operation Searchlight-এর প্রস্তুতি)।
  • ২৫ মার্চ মধ্যরাত: পাকিস্তানি সামরিক জান্তা রাজধানী ঢাকায় ঘুমন্ত নিরস্ত্র মানুষের ওপর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, ট্যাংক ও মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যা ইতিহাসে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও পিলখানায় বর্বর গণহত্যা চালানো হয়।
  • গ্রেপ্তার: ২৫ মার্চ রাত ১টা ১৫ মিনিটে (২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে) ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাসভবন থেকে পাকিস্তানি কমান্ডোরা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তীতে পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি করে নিয়ে যায়।

৬.৬ স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

গ্রেপ্তার হওয়ার প্রাক্কালে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে (আনুমানিক রাত ১২টা ২০ মিনিটে) শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেস ও ইপিসিআরআই-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রচার করেন:
“এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের যেখানেই আপনাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে আপনারা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। পাকিস্তানি বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত না করা পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকুক। জয় বাংলা।”
পরবর্তীতে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবের পক্ষে এই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পুনরায় পাঠ করেন। এর মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালি জাতির নয় মাসব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।

অধ্যায় ৭: পাকিস্তানের বন্দিজীবন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন

৭.১ পাকিস্তানের বন্দিজীবন ও সামরিক ট্রাইব্যুনাল (১৯৭১)

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তারের পর শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা থেকে করাচি এবং পরবর্তীতে পশ্চিম পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির কাছে মিয়ানওয়ালি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তাঁকে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ কারাবাসে (Solitary Confinement) রাখা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে বাইরের জগতের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল; এমনকি যুদ্ধের বাস্তব পরিস্থিতি, ঢাকায় গণহত্যা কিংবা ভারতে অবস্থানরত প্রবাসী সরকারের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা সম্পর্কে তাঁকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
১৯৭১ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে মিয়ানওয়ালি কারাগারের ভেতরেই এক সামরিক আদালতে (Military Tribunal) তাঁর বিরুদ্ধে বিচারকাজ পরিচালিত হয়। সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’, ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা’ এবং ‘সামরিক বিদ্রোহে প্ররোচনা’সহ ১২টি ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়। আদালতের কোনো বৈধতা স্বীকার না করলেও একজন আইনজীবী (একে ব্রোহি) তাঁকে ডিফেন্ড করার জন্য নিযুক্ত হন। সামরিক আদালত প্রহসনের বিচার শেষে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রাণদণ্ডে (মৃত্যুদণ্ড) দণ্ডিত করে।
ঐতিহাসিক বিবরণ ও নথি: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বন্দিশালায় শেখ মুজিবের কবর পর্যন্ত খোঁড়া হয়েছিল। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি কোনো ধরনের আপস করতে বা নতিস্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান।
[২৫ মার্চ ১৯৭১: গ্রেপ্তার] ──> [মিয়ানওয়ালি কারাগারে স্থানান্তর] ──> [সামরিক ট্রাইব্যুনালে মৃত্যু পরোয়ানা] ──> [৮ জানুয়ারি ১৯৭২: মুক্তি]

৭.২ বৈশ্বিক জনমত, মুক্তি ও লন্ডন-নয়াদিল্লি সফর

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকায় মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের বিজয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রবল চাপের মুখে পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন।
  • ৮ জানুয়ারি ১৯৭২: পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে পিআইএ-এর একটি বিশেষ বিমানে করে লন্ডনে পাঠিয়ে দেয়।
  • লন্ডনে অবস্থান (৮-৯ জানুয়ারি): লন্ডনের ক্ল্যারিজেস হোটেলে তিনি এক সাংবাদিক সম্মেলন করেন, যেখানে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বাস্তবতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে তাঁর সঙ্গে দেখা করে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সম্মান প্রদর্শন করেন।
  • নয়াদিল্লি সফর (১০ জানুয়ারি সকাল): লন্ডন থেকে ঢাকায় ফেরার পথে তিনি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নামেন। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিক তাঁকে উষ্ণ সংবর্ধনা জানান। সেখানে তিনি ভারতের প্রতি বাঙালি জাতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং একই সঙ্গে ভারতীয় মিত্রবাহিনীকে দ্রুত বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহারের বিষয়ে রাজনৈতিক নীতি স্পষ্ট করেন।

৭.৩ ১০ জানুয়ারি ১৯৭২: ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বিকেলে বিমানবাহিনীর বিশেষ উড়োজাহাজে করে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান। বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে লাখো মানুষের ঢল নামে।
তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি যান রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। সেখানে আবেগঘন কণ্ঠে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, যুদ্ধোত্তর রূপরেখা এবং নতুন রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা ঘোষণা করেন।

অধ্যায় ৮: রাষ্ট্র পরিচালনা, সংবিধান প্রণয়ন ও যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন (১৯৭২–১৯৭৩)

৮.১ সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা গ্রহণ ও নতুন সরকার গঠন

স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপ্রধানের (প্রেসিডেন্ট) পদ ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশকে একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন।
  • ১২ জানুয়ারি ১৯৭২: তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ দেন।
  • মূল চালিকাশক্তি: তিনি উপলব্ধি করেন যে বহু বছরের সামরিক শাসনের পর বাংলাদেশে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

৮.২ ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন ও মূলনীতিসমূহ

শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক অর্জন ছিল স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ, আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সংবিধান উপহার দেওয়া।
  • সংবিধান প্রণয়ন কমিটি: ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি করে ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়।
  • সংবিধান গ্রহণ: ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ (বিজয়ের প্রথম বার্ষিকীতে) তা কার্যকর হয়।
সংবিধানের মূল চার নীতি:
  1. জাতীয়তাবাদ: বাঙালি সংস্কৃতির মৌলিক ঐক্যের ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয় সংজ্ঞায়িত করা।
  2. সমাজতন্ত্র: শোষণে মুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন।
  3. গণতন্ত্র: মৌলিক মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা।
  4. ধর্মনিরপেক্ষতা: রাষ্ট্রে ধর্মভিত্তিক বৈষম্য বিলোপ এবং সকল ধর্মের নাগরিকদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
[১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর: সংবিধান গ্রহণ]
         │
         ├── ১. জাতীয়তাবাদ
         ├── ২. সমাজতন্ত্র
         ├── ৩. গণতন্ত্র
         └── ৪. ধর্মনিরপেক্ষতা

৮.৩ যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো repair, পুনর্বাসন ও অর্থনীতির পুনর্গঠন

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারের সামনে যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছিল, তা ছিল অভূতপূর্ব। যুদ্ধের কারণে দেশের রাস্তাঘাট, সেতু, বন্দর (বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর), কারখানা এবং কৃষিসম্পদ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছিল। এছাড়া ভারতে আশ্রয় নেওয়া ১ কোটি শরণার্থীকে পুনর্বাসন করা ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ।
শেখ মুজিব সরকারের প্রাথমিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ:
  • শিল্প জাতীয়করণ নীতি (১৯৭২): পরিত্যক্ত কারখানা এবং অধিকাংশ বড় শিল্প ও ব্যাংক জাতীয়করণ করা হয়।
  • কৃষি সংস্কার: ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করা হয় এবং পরিবারপ্রতি সর্বোচ্চ জমি রাখার সীমা (ল্যান্ড সিলিং) ১০০ বিঘায় নামিয়ে আনা হয়। কৃষকদের মধ্যে বীজ, সার ও টিউবওয়েল ভর্তুকি মূল্যে বিতরণ করা হয়।
  • পরিকল্পনা কমিশন গঠন: প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান, ড. নূরুল ইসলাম প্রমুখের সমন্বয়ে প্রথম পরিকল্পনা কমিশন গঠন করা হয় এবং ১৯৭৩ সালে ‘প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা’ (First Five-Year Plan) গ্রহণ করা হয়।

৮.৪ ১৯৭৩ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচন

১৯৭২ সালের সংবিধানের অধীনে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মতে, এই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিপুল জনসমর্থন লাভ করে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসন পেয়ে বিজয়ী হয়। তবে কয়েকটি আসনে বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং কারচুপির অভিযোগ ওঠে—যা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের বিকাশে কিছু নেতিবাচক চর্চার সূচনা করে।

অধ্যায় ৯: ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ

৯.১ ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ: কারণ ও বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে বিশ্বব্যাংক ও অর্থনীতিবিদদের প্রাক্কলন অনুযায়ী লাখো মানুষের অনাহার ও অপুষ্টিজনিত রোগে মৃত্যু হয়। এই দুর্ভিক্ষ ছিল শেখ মুজিবুর রহমান সরকারের সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়।
দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণসমূহ:
  1. প্রাকৃতিক দুর্যোগ: ১৯৭৪ সালের মে থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে দেশজুড়ে অভূতপূর্ব বন্যা ও অতিবৃষ্টির ফলে আমন ধানের ফলন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  2. আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও খাদ্য রাজনীতি: যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে খাদ্য সাহায্য বন্ধ করে দেয়। এর মূল কারণ ছিল বাংলাদেশের সাথে কিউবার মধ্যকার পাট রফতানি চুক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘Food for Peace’ (PL 480) কর্মসূচির অধীন খাদ্যবাহী জাহাজ মধ্যপথে আটকে দেয়।
  3. প্রশাসনিক দুর্বলতা ও চোরাচালান: চালের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফাখোর, মজুতদার ও কালোবাজারিরা। সীমান্ত দিয়ে ভারতে চাল ও খাদ্য সামগ্রী চোরাচালান রোধে সরকার ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়।
[১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ] ──> [বন্যা ও ফসল হানি] + [মার্কিন পিএল-৪৮০ খাদ্য আটকে দেওয়া] + [চোরাচালান ও কালোবাজারি]

৯.২ দুর্নীতি, চোরাচালান ও রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা

যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। অস্ত্র জমা দেওয়ার আহ্বান সত্ত্বেও অনেক অসামাজিক উপাদান ও রাজনৈতিক সশস্ত্র গোষ্ঠী অস্ত্র জমা দেয়নি।
  • জাতীয় রক্ষীবাহিনী (Jatiya Rakkhi Bahini – JRB): ১৯৭২ সালে একটি আধা-সামরিক বাহিনী হিসেবে জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা। কিন্তু রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে দ্রুতই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ (বিশেষ করে জাসদ ও বামপন্থীদের) নির্যাতন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মারাত্মক অভিযোগ ওঠে।
  • দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতা: যুদ্ধোত্তর ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ, রেশনের চাল এবং লাইসেন্স-পারমিট বিতরণে সরকারি দলের কিছু নেতা ও অসাধু আমলাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। শেখ মুজিবুর রহমান একাধিক ভাষণে এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, “চাটার দল সব খেয়ে ফেলল, আমি পেলাম কম্বল চোর।”

অধ্যায় ১০: বাকশাল, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও গণতন্ত্রের সংকট (১৯৭৪–১৯৭৫)

১০.১ জরুরি অবস্থা ও বহুদলীয় রাজনীতির সংকোচন

দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক সহিংসতা (যেমন থানা আক্রমণ ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড) এবং অর্থনৈতিক মন্দা সামাল দিতে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে শেখ মুজিবুর রহমান দেশে প্রথমবারের মতো ‘জরুরি অবস্থা’ (State of Emergency) ঘোষণা করেন। এর ফলে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার স্থগিত হয়ে যায়।

১০.২ চতুর্থ সংশোধনী ও একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল)

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক আমূল ও বিতর্কিত পরিবর্তন ঘটে।
চতুর্থ সংশোধনীর মূল দিকসমূহ:
  1. শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন: সংসদীয় গণতন্ত্র বাতিল করে ‘রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার’ (Presidential System) চালু করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন।
  2. একদলীয় ব্যবস্থা (বাকশাল): দেশের অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক ওয়ান পার্টি’ (বাকশাল) নামে একটিমাত্র জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়।
  3. সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকোচন: মাত্র চারটি সরকারি নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র (দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার ও বাংলাদেশ টাইমস) ব্যতীত দেশের সকল সংবাদপত্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
  4. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংকুচিতকরণ: সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়।
[সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনী (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫)]
         │
         ├── সংসদীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত ──> রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার
         ├── সকল দল বিলুপ্ত ──> ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠা
         └── সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত ──> মাত্র ৪টি পত্রিকা চালু রাখা

১০.৩ বাকশালের যৌক্তিকতা বনাম গণতান্ত্রিক সমালোচনা

শেখ মুজিবুর রহমান বাকশালকে অভিহিত করেছিলেন ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ হিসেবে। তাঁর মতে, শোষিত ও দরিদ্র মানুষের মুক্তি, দুর্নীতি দমন, বাধ্যতামূলক কৃষি সমবায় চালু করা এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের জন্য এই কঠোর ও একচ্ছত্র পদক্ষেপ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প ছিল না।
তবে, আধুনিক ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মূল্যায়নে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা—গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বহু ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে গড়ে ওঠা গণতন্ত্রকে একটি একদলীয় কাঠামোর ভেতর নিয়ে আসায় শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তায় চিড় ধরে এবং বিরোধী শক্তি ও সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তুষ্ট অংশ এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে।

অধ্যায় ১১: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫: হত্যাকাণ্ড, বিচারিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

১১.১ ঘটনার পটভূমি ও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ

১৯৭৫ সালের প্রথমার্ধেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে গভীর অসন্তোষ ঘনীভূত হতে থাকে। বাকশাল গঠন, বহুদলীয় রাজনীতির অবসান এবং সংবাদপত্রের ওপর বিধিনিষেধের ফলে দেশের একদলীয় শাসনব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। একই সঙ্গে, সেনাবাহিনী এবং নবগঠিত ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’র মধ্যে পেশাগত সুযোগ-সুবিধা ও ভূমিকা নিয়ে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সেনাবাহিনীর কিছু বয়োজ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মকর্তা, যাদের মধ্যে অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর ক্ষুব্ধ হন। মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান, মেজর খন্দকার আব্দুর রশিদ, মেজর শরিফুল হক ডালিম, মেজর নূর চৌধুরী এবং মেজর মহিউদ্দিন আহমেদের মতো জুনিয়র সেনা কর্মকর্তারা গোপনে একটি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করতে শুরু করেন। অন্যদিকে, তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদসহ আওয়ামী লীগের ভেতরেই অবস্থানরত একটি চক্রান্তকারী গোষ্ঠী এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে নেপথ্যে যুক্ত হয়।

১১.২ ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর কালরাত

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের প্রথম প্রহরে (রাত আনুমানিক ৫:০০ থেকে ৫:৩০ ঘটিকার মধ্যে) ঘাতক সেনা দল তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের ৬৭৭ নম্বর বাড়ি, ধানমণ্ডির শেখ ফজলুল হক মনি এবং আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবনে একযোগে হামলা চালায়।

ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে আক্রমণ শুরু হলে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং সেনা সদরে ফোন করেন। কিন্তু সেনাপ্রধান বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো সহায়তা পৌঁছায়নি।

[১৫ আগস্ট ১৯৭৫: ঘাতকদের তিনমুখী আক্রমণ]
         │
         ├── ১. ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর (শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন)
         ├── ২. ধানমণ্ডি (শেখ ফজলুল হক মনির বাসভবন)
         └── ৩. মিন্টো রোড (আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসভবন)

ঘাতক দল ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে প্রবেশ করে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। সিঁড়ির ধাপে শেখ মুজিবুর রহমানকে গুলিবর্ষণ করে হত্যা করা হয়। ওই কালরাতে তাঁর সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্য—সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল, মধ্যম পুত্র শেখ জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল (মাত্র ১০ বছর বয়সী), পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও পারভীন জামাল রোজী, শেখ মুজিবের একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, এবং ব্যক্তিগত কর্মচারী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

একই সময়ে শেখ ফজলুল হক মনি, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ মোট ২৬ জন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কেবল শেখ মুজিবুর রহমানের দুই কন্যা—শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা—তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করার কারণে প্রাণে বেঁচে যান।

১১.৩ হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ

হ হত্যাকাণ্ডের পরপরই খন্দকার মোশতাক আহমেদ রেডিও স্টেশনে গিয়ে নিজেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। দেশের সংবিধানে উল্টে দিয়ে সামরিক আইন জারি করা হয়। খন্দকার মোশতাক সরকারের পর ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে এবং একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান (৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বর ১৯৭৫)-এর মধ্য দিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।

১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ জারি করেন কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ (Indemnity Ordinance 1975)। এই অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য ছিল ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডে জড়িত সেনা কর্মকর্তাদের আইনগত বিচার থেকে দায়মুক্তি বা সুরক্ষা দেওয়া। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে বিচার পাওয়ার পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করা হয়।

[২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫: ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি] ──> [খন্দকার মোশতাক কর্তৃক ঘাতকদের দায়মুক্তি] ──> [১৯৭৯: ৫ম সংশোধনীতে স্থায়ী রূপ প্রদান]

১১.৪ দীর্ঘ আইনি পথ, ইনডেমনিটি বাতিল ও বিচারিক প্রক্রিয়া

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচারের আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

  1. ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল (১৯৯৬): ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল আইন পাস হয়।

  2. মামলা ও তদন্ত: পুরান ঢাকার ধানমণ্ডি থানায় ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর শেখ মুজিবুর রহমানের রেসিডেন্সিয়াল পিএ মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে এফআইআর দায়ের করেন।

  3. বিচারিক রায় (১৯৯৮): ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।

  4. হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় (২০০১–২০০৯): আপিল এবং রিভিউ শুনানির দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ১২ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।

  5. দণ্ড বাস্তবায়ন (২০১০ ও ২০২০): ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রথম ধাপে পাঁচজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির (ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মহিউদ্দিন আহমেদ, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিন) ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল গ্রেপ্তার হওয়া অপর আসামি আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বাকি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা বিদেশে পলাতক রয়েছেন।

অধ্যায় ১২: ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও মানবিক দিক

১২.১ পরিবার, দাম্পত্য জীবন ও শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব

শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের পেছনে তাঁর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের (রেণু) অবদান ছিল অপরিসীম। ১৯৩৮ সালে বাল্য বয়সে তাঁদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর থেকে জীবনের প্রতিটি রাজনৈতিক সংকটে তিনি শেখ মুজিবের পাশে অটল থেকেছেন।

শেখ মুজিবের দীর্ঘ কারাবাসের দিনগুলোতে ফজিলাতুন নেছা মুজিব কেবল পরিবার ও সন্তানদের লালন-পালন করেননি, বরং আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, রাজবন্দীদের আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করা এবং রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা গোপন বার্তা আকারে নেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬৮ সালে আগরতলা মামলার সময় যখন শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তখন ফজিলাতুন নেছা মুজিবই দূরদর্শিতার সঙ্গে স্বামীকে প্যারোলে মুক্তি না নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে অনড় থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

[শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব (রেণু)]
         │
         ├── পরিবার পরিচালনা ও সন্তান লালন-পালন
         ├── কারাবন্দী শেখ মুজিবের পক্ষে দলীয় নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা প্রদান
         └── ১৯৬৮-এ প্যারোল বর্জন করে নিঃশর্ত মুক্তির দূরদর্শী পরামর্শ

১২.২ সন্তানরা ও তাঁদের জীবনসংগ্রাম

শেখ মুজিবুর রহমান ও ফজিলাতুন নেছা মুজিবের পাঁচ সন্তান—শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেল—পিতার দীর্ঘ কারাবাসের কারণে এক ভিন্নতর শৈশব ও কৈশোর পার করেছেন।

  • শেখ কামাল: জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র এবং বাংলাদেশের আধুনিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের (আবাহনী ক্রিড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা) অগ্রদূত।

  • শেখ জামাল: দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামাল মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত রয়েল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্ট (Sandhurst) থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন।

  • শেখ রাসেল: কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল ছিলেন ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র, যার মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৫ আগস্টের রাতে মর্মান্তিক জীবনাবসান ঘটে।

১২.৩ ব্যক্তি শেখ মুজিব: স্বভাব, বন্ধুত্ব ও জনসম্পর্ক

শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এক অসাধারণ জনমোহিনী ব্যক্তিত্বের (Charismatic Personality) অধিকারী ছিলেন। অতি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সঙ্গে মিশে যাওয়া, তাদের নাম মনে রাখা এবং তাদের দুঃখ-দুর্দশায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ার ক্ষমতা তাঁকে বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে ‘বঙ্গবন্ধু’ করে তুলেছিল।

তাঁর ব্যক্তিগত অভ্যাস ছিল সাধারণ: পাইপ খাওয়া, বাংলা সাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি করা এবং সাধারণ গ্রামীণ খাবার পছন্দ করা। দেশি-বিদেশি বন্ধু ও সমসাময়িক রাজনৈতিক নেতাদের (যেমন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন আহমদ) সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর সম্মান ও আস্থার, যদিও রাজনৈতিক আদর্শিক প্রশ্নে অনেক সময় তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল।

অধ্যায় ১৩: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি ও শীতল যুদ্ধকালীন রাজনীতি

১৩.১ স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি: “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়”

১৯৭২ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করেন: “Friends to all, malice towards none” (সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়)। শীতল যুদ্ধের সময়ে দ্বি-মেরুকেন্দ্রিক বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্ত না হয়ে বাংলাদেশকে একটি নিরপেক্ষ, জোটনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তাঁর কূটনৈতিক লক্ষ্য।

১৩.২ বৃহৎ শক্তিবর্গ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে কূটনীতি

  • ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্ক: ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মৈত্রী সম্পর্ক ছিল অন্যতম স্তম্ভ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তা স্মরণে রেখেও শেখ মুজিব ভারতের সামরিক বাহিনীকে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করেন। ১৯৭২ সালের ১৫ মার্চের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে—যা বিশ্ব কূটনৈতিক ইতিহাসে বিরল। ১৯৭৪ সালে ভারতের সাথে সীমান্ত চিহ্নিতকরণ চুক্তি (মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি) স্বাক্ষরিত হয়।

  • সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ভেটো প্রদান ও সমর্থনকারী সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। অন্যদিকে, ১৯৭১-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা সত্ত্বেও, যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসন ও খাদ্য সহায়তার জন্য শেখ মুজিব যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং নমনীয় কৌশল অবলম্বন করেন।

[পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি]
         │
         ├── ভারত: সৈন্য প্রত্যাহার (১৯৭২) ও সীমান্ত চুক্তি (১৯৭৪)
         ├── সোভিয়েত ইউনিয়ন: চট্টগ্রাম বন্দর মাইনমুক্তকরণ ও অর্থনৈতিক সাহায্য
         ├── ইসলামী বিশ্ব (OIC): ১৯৭৪ লাহোর শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ ও স্বীকৃতি অর্জন
         └── জাতিসংঘ (UN): ১৯৭৪ সালে সদস্যপদ লাভ ও বাংলায় ভাষণ প্রদান

১৩.৩ জাতিসংঘে যোগদান ও ওআইসি (OIC) শীর্ষ সম্মেলন

  • OIC সম্মেলন (১৯৭৪): পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বহু মুসলিম দেশ বাংলাদেশকে শুরুতে স্বীকৃতি দেয়নি। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স (OIC)-এর শীর্ষ সম্মেলনে পাকিস্তান বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় এবং শেখ মুজিব প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে লাহোর গমন করেন।

  • জাতিসংঘের সদস্যপদ (১৯৭৪): ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যপদ লাভ করে। ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষায় ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ভাষার মর্যাদাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

অধ্যায় ১৪: ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, মূল্যায়ন ও বিতর্ক

১৪.১ স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদান বনাম রাষ্ট্র পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে গবেষক ও ইতিহাসবিদগণ তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে প্রধানত দুটি পর্বে বিভক্ত করে বিশ্লেষণ করেন:

সময়কাল ও ক্ষেত্র ঐতিহাসিক অবদান ও ভূমিকা ঐতিহাসিক পর্যালোচনা ও সীমাবদ্ধতা
১৯৪৭–১৯৭১: আন্দোলন ও স্বাধীনতা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ, ছয় দফা, ৭ মার্চের ভাষণ, অদম্য নেতৃত্ব এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে একক অনুঘটকের ভূমিকা। পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘসময় ধরে সাংবিধানিক সমাধানের চেষ্টা চালানো নিয়ে বামপন্থী শিবিরের সমালোচনা।
১৯৭২–১৯৭৫: রাষ্ট্র পরিচালনা ১৯৭২ সালের সংবিধান, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন, প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি ও যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ন্ত্রণহীনতা, রক্ষীবাহিনীর অপব্যবহার, বাকশাল গঠন (৪র্থ সংশোধনী) এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত করা।

১৪.২ ভাবমূর্তির রূপান্তর ও পরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণ

১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে ব্যাপক মেরুকরণ ঘটে। সামরিক শাসন ও পরবর্তী বিরোধী দলীয় সরকারগুলোর আমলে পাঠ্যপুস্তক, সরকারি গণমাধ্যম ও জাতীয় ইতিহাস থেকে শেখ মুজিবের অবদানকে মুছে ফেলার বা সংকুচিত করার রাজনৈতিক চেষ্টা চলে।

পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে সংবিধানে পুনপ্রতিষ্ঠা করা হয় এবং তাঁর ভাবমূর্তিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। তবে সমালোচকদের মতে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল কর্তৃক তাঁর অবদানকে অতি-রাজনৈতিকীকরণ বা ‘ব্যক্তিপূজা’য় রূপান্তরের ফলে জাতীয় ইতিহাসে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের পথ মাঝে মাঝে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

১৪.৩ সার্বিক ঐতিহাসিক বিচার

ঐতিহাসিক বিচারে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ঔপনিবেশিক ও সামরিক শাসন শৃঙ্খল থেকে একটি জাতিকে মুক্ত করার মহাকাব্যিক নেতা। তাঁর সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও, বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ড ও জাতীয় পরিচয় এনে দেওয়ার প্রধান স্থপতি হিসেবে ইতিহাস তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও অমীমাংসিত প্রশ্ন

১. ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের বিস্তারিত সিদ্ধান্তমালা: শেখ মুজিবুর রহমান কেন আত্মগোপনে বা প্রবাসী সরকারের নেতৃত্ব দিতে ভারতে যাননি এবং কেন নিজ বাসভবনে অবস্থান করে গ্রেপ্তার বরণ করলেন—এই বিষয়ে তৎকালীন শীর্ষ রাজনৈতিক সহকর্মীদের (যেমন তাজউদ্দীন আহমদ) স্মৃতিচারণ ও নথির মধ্যে ব্যাখ্যার ভিন্নতা রয়েছে।

২. ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের চূড়ান্ত মৃত্যুর সংখ্যা: রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গবেষকদের তথ্যে নিহতের সংখ্যায় ব্যাপক তারতম্য দেখা যায় (২৫,০০০ থেকে ১,০০,০০০ বা তারও বেশি)। নির্ভরযোগ্য ও সর্বজনগ্রাহ্য তথ্যের ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে।

৩. বাকশাল গঠন প্রক্রিয়ার অভ্যন্তরীণ দস্তাবেজ: একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালুর পেছনে তৎকালীন সোভিয়েত ব্লকের ভূরাজনৈতিক চাপ নাকি শেখ মুজিবের নিজস্ব প্রশাসনিক কৌশল ছিল—তা নিয়ে ঐতিহাসিক দলিলগুলোর আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

গ্রন্থপঞ্জি ও প্রধান উৎসসমূহ

প্রাথমিক উৎস (Primary Sources)

১. রহমান, শেখ মুজিবুর। অসমাপ্ত আত্মজীবনী। ঢাকা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল), ২০১২।

২. রহমান, শেখ মুজিবুর। কারাগারের রোজনামচা। ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০১৭।

৩. রহমান, শেখ মুজিবুর। আমার দেখা নয়াচীন। ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০২০।

৪. বাংলাদেশ সরকার। Secret Documents of Intelligence Branch on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman (Vol. 1–14)। ঢাকা: হাক্কানী পাবলিশার্স।

৫. বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (১ম–১৫শ খণ্ড)। তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

মাধ্যমিক ও গবেষণাগ্রন্থ (Secondary Sources)

১. আহমদ, তাজউদ্দীন। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি (১৯৪৭-১৯৭১)। ঢাকা: প্রতিভাস।

২. হোসেন, ড. কামাল। Bangladesh: Quest for Freedom and Justice. Oxford University Press, 2013.

৩. সোবহান, রেহমান। Untranquil Recollections: The Years of Fulfilment. Sage Publications, 2015.

৪. ইসলাম, সিরাজুল (সম্পাদিত)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ। ঢাকা: এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ।

৫. চৌধুরী, আফসান। ১৯৭১: অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ। ঢাকা: কথাপ্রকাশ।

৬. Lifschultz, Lawrence. Bangladesh: The Unfinished Revolution. Zed Press, 1979.

৭. Maniruzzaman, Talukder. The Bangladesh Revolution and Its Aftermath. Bangladesh Books International, 1980.

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Keep Up to Date with the Most Important News

By pressing the Subscribe button, you confirm that you have read and are agreeing to our Privacy Policy and Terms of Use
Press Nation Bangladesh