বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এমন এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন ও কর্ম সরাসরি জড়িয়ে আছে দেশের ইতিহাসের কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের সঙ্গে। একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা, স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনী পুনর্গঠনে অবদান, ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আগমন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বৈদেশিক নীতিতে আনা পরিবর্তনসমূহ বাংলাদেশের সমসাময়িক ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
জিয়াউর রহমানকে মূল্যায়ন করতে গেলে তাঁকে কোনো একক পরিচয়ে আবদ্ধ করা যায় না। তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীরা তাঁকে সামরিক শাসনের প্রবক্তা এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করান; অন্যদিকে তাঁর সমর্থক ও অনুসারীরা তাঁকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, গ্রামীণ উন্নয়নের রূপকার এবং সংকটময় মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে অভিহিত করেন। একজন গবেষক বা ইতিহাস বিশ্লেಷকের দায়িত্ব হলো কোনো পক্ষপাত বা আবেগ দ্বারা চালিত না হয়ে ঐতিহাসিক দলিল, সমসাময়িক তথ্য, স্বাধীন গবেষণা এবং বিভিন্ন পক্ষের যুক্তির ভিত্তিতে একটি সত্যনিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র তুলে ধরা। এই জীবনীতে ঠিক সেই নিরপেক্ষ ও প্রামাণ্য দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার চেষ্টা করা হবে।
প্রথম অধ্যায়: জন্ম, পরিবার ও শৈশব
১.১ জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক শিকড় এই অঞ্চলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হলেও পেশাগত কারণে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
তাঁর পিতা মনসুর রহমান পেশায় একজন সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। তিনি কলকাতা শহরে সরকারি দপ্তরে কেমিস্ট বা রসায়নবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ফলে জিয়াউর রহমানের প্রাথমিক জীবন এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশ কেবল গ্রামীণ বগুড়ার সীমানায় আবদ্ধ ছিল না, বরং তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ছোঁয়া তাঁর পরিবারে ছিল।
১.২ শৈশব ও পারিবারিক শৃঙ্খলা
পারিবারিক সূত্রে জিয়াউর রহমান একটি শৃঙ্খলিত ও মধ্যবিত্ত পরিবেশ পেয়েছিলেন। পিতা মনসুর রহমানের কর্মক্ষেত্র কলকাতা হওয়ায় পরিবারের একটি অংশ সেখানে অবস্থান করত। জিয়াউর রহমানের শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে কলকাতায়। পারিবারিক শৃঙ্খলা, পড়াশোনার প্রতি গুরুত্ব এবং একটি সুসংহত পারিবারিক পরিবেশ তাঁর মধ্যে ছোটবেলা থেকেই একটি গাম্ভীর্য ও নিয়মানুবর্তিতা তৈরি করেছিল বলে তাঁর জীবনীকার ও সমসাময়িকদের লেখায় উঠে এসেছে।
তবে পরবর্তী জীবনের রাজনৈতিক বা সামরিক সফলতার আলোকে তাঁর শৈশবকে অতিমানবীয় বা পূর্বনির্ধারিত কোনো অলৌকিক বৈশিষ্ট্যের মোড়কে উপস্থাপন করা ইতিহাসচর্চার দৃষ্টিতে সঠিক নয়। তৎকালীন বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেই তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়েছিল।
১.৩ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ব্রিটিশ ভারতের শেষ পর্যায় ও দেশভাগ
জিয়াউর রহমানের জন্ম এমন এক সময়ে হয়েছিল, যখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছে। তাঁর শৈশবের বছরগুলোতে সংঘটিত হয় ১৯৪৩ সালের মহামন্বন্তর, ১৯৪৬ সালের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ও দাঙ্গা এবং পরিশেষে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন।
দেশভাগের পর তাঁর পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাঙালি মুসলমানদের সামাজিক গতিপ্রকৃতি, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ এবং সরকারি চাকুরে পরিবারগুলোর জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি তাঁর প্রজন্মের তরুণদের মানস গঠনে একটি অবচেতন ভূমিকা রেখেছিল, যা পরবর্তী সময়ে তাঁদের পেশাগত জীবনে প্রভাব বিস্তার করে।
দ্বিতীয় অধ্যায়: শিক্ষাজীবন ও সামরিক বাহিনীতে প্রবেশ
২.১ শিক্ষাজীবন
পিতা কলকাতার সরকারি চাকুরে হওয়ার সুবাদে জিয়াউর রহমানের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় কলকাতায়। কলকাতা হেয়ার স্কুল বা সমসাময়িকভাবে কলকাতার কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁর শিক্ষাজীবনের একটি অংশ কেটেছিল বলে জানা যায়। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পরিবারসহ পূর্ব পাকিস্তানে স্থায়ী হওয়ার পর তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অব্যাহত থাকে।
তিনি বগুড়া জেলা স্কুল এবং পরবর্তীতে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। ১৯৫২ সালে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিকুলেশন বা মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি খেলাধুলা বিশেষ করে ফুটবলের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তাঁর মধ্যে এক ধরনের নীরব স্বভাব, কম কথা বলার প্রবণতা এবং কাজে মনোযোগ দেওয়ার বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যেত, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর সামরিক জীবনেও বজায় ছিল।
২.২ পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান ও সামরিক প্রশিক্ষণ
মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর ১৯৫৩ সালে জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এই প্রেক্ষাপটে একজন বাঙালি তরুণ হিসেবে সামরিক পেশাকে বেছে নেওয়া ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ ও সাহসিকতার ব্যাপার।
তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি (PMA), কাকুলে ক্যাডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মজীবনের শুরুতে তাঁকে বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সামরিক প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত কার্যদক্ষতায় তিনি বরাবরই শৃঙ্খলিত ও মনোযোগী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
২.৩ ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী মূলত পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক অফিসারদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের সংখ্যা ছিল নগণ্য এবং উচ্চপদগুলোতে বাঙালিদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য কাজ করত। এই বৈষম্য কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সামরিক কাঠামোর ভেতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাঙালিদের প্রান্তিক করে রাখার প্রবণতা স্পষ্ট ছিল।
এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান পেশাগত দক্ষতা, সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেন। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামা সময়ে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি গোয়েন্দা সংস্থায় (যেমন: তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা শাখা) এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে তিনি খেমকারান সেক্টরে একটি ইনফ্যান্ট্রি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর সামরিক দক্ষতার জন্য প্রশংসিত হন।
২.৪ সামরিক অভিজ্ঞতা ও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের চাকরি জীবন জিয়াউর রহমানকে আধুনিক সামরিক কৌশল, অস্ত্র চালনা, ইউনিট পরিচালনা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পরিপক্ব করে তোলে। একই সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং বাঙালি জনগণের ওপর রাজনৈতিক নিপীড়ন তিনি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এই পেশাগত অভিজ্ঞতা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর জন্য প্রাক-শর্ত হিসেবে কাজ করেছিল।
তৃতীয় অধ্যায়: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণা
৩.১ ১৯৭১ সালের মার্চের রাজনৈতিক সংকট ও সামরিক অভিযানের পটভূমি
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সত্ত্বেও তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। মার্চ মাসজুড়ে সারা পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর নির্মম গণহত্যা শুরু করে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সদস্য ও বিভিন্ন শৃঙ্খলা বাহিনীর বাঙালি কর্মকর্তারা বিদ্রোহের মুখোমুখি দাঁড়ান।
৩.২ চট্টগ্রামে বিদ্রোহ ও জিয়াউর রহমানের অবস্থান
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে জিয়াউর রহমান মেজর পদে উন্নীত হয়ে চট্টগ্রামের ষোলশহরে অবস্থিত ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড (2IC) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি নিধন অভিযানের খবর পাওয়ার পর এবং তাঁদের নিরস্ত্র করার কৌশলী চেষ্টা টের পেয়ে জিয়াউর রহমান ও তাঁর অধীনস্থ বাঙালি সৈনিকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
সামরিক নথি ও সহযোদ্ধাদের বিবরণ অনুযায়ী, তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার (সিও) ছিলেন পাকিস্তানি কর্মকর্তা লেফট্যানেন্ট কর্নেল রশিদ জানজুয়া। ২৫ মার্চ রাতে জানজুয়া চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ে থাকা অস্ত্রবাহী জাহাজ ‘এমভি সোয়াত’ থেকে অস্ত্র খালাসের অজুহাতে জিয়াউর রহমানকে ষোলশহর থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। পথিমধ্যে খবর পেয়ে জিয়াউর রহমান ষোলশহর ব্যারাকে ফিরে আসেন এবং বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে পাকিস্তানি অফিসারদের বন্দী করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বাঙালি সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “I revolt” (আমি বিদ্রোহ করলাম)। পরবর্তীতে তিনি কালুরঘাট রেডিও স্টেশন অভিমুখে রেজিমেন্ট নিয়ে অগ্রসর হন এবং চট্টগ্রামের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সামরিক ভিত্তি প্রদান করেন।
৩.৩ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র ও স্বাধীনতার ঘোষণা
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ একটি অত্যন্ত আলোচিত ও ঐতিহাসিক ঘটনা।
২৫ মার্চের গণহত্যার পর চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ (যেমন এম এ হান্নানসহ অন্য নেতারা) প্রথমে একটি স্বল্প ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সমিটারে স্বাধীনতা ও প্রতিরোধের বার্তা প্রচার করেন। পরবর্তীতে ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র চালু করা হলে সেখানে সামরিক দিকনির্দেশনা ও জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য একজন সামরিক অফিসারের বক্তব্যের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রে এসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতাদের অনুরোধ ও সম্মতিক্রমে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন।
প্রথম পাঠ: মেজর জিয়াউর রহমান প্রথমে নিজের নামে একটি স্বঘোষিত স্বাধীনতার বার্তা পাঠ করেন।সংশোধিত পাঠ: পরবর্তীতে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দূরদর্শিতার নিরিখে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে নতুন সংস্করণ পাঠ করা হয়।“I, Major Ziaur Rahman, do hereby declare Independence of Bangladesh on behalf of our great national leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman…”(আমি, মেজর জিয়াউর রহমান, আমাদের মহান জাতীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি…)
ঐতিহাসিক মূল্যায়নের ভিন্নতা ও দলিল
-
একক সত্তা নাকি সমন্বিত ভূমিকা: রাজনৈতিকভাবে দুটি ভিন্ন মত প্রবাহ দেখা যায়—এক পক্ষ জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে একক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করতে চান, অন্য পক্ষ তাঁর পাঠকে শেখ মুজিবুর রহমানের মূল ঘোষণার একটি ‘রেডিও পাঠ বা ঘোষণা পুনরুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
-
স্বাধীন গবেষক ও দলিল ভিত্তিক বিশ্লেষণ: প্রামাণ্য ইতিহাস ও ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’ পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচারিত ঘোষণাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রিক বার্তা। তবে ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমানের রেডিও ঘোষণাটি নিশ্চিতভাবেই দিশেহারা ও আতঙ্কগ্রস্ত বাঙালি জাতি এবং সশস্ত্র বাহিনীগুলোর মধ্যে অভূতপূর্ব মনোবল বৃদ্ধি করে এবং বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানবিরোধী যুদ্ধের একটি প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক ভিত্তি তৈরি করে।
৩.৪ সেক্টর কমান্ড ও ‘জেড ফোর্স’ গঠন
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের যুদ্ধক্ষেত্রকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। জিয়াউর রহমানকে ১ নম্বর সেক্টর (চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা) কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের জুন-জুলাই মাসের দিকে ভারতের তেলিয়াপাড়ায় সেক্টর কমান্ডারদের সভায় একটি সুসংগঠিত নিয়মিত ব্রিগেড গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
জিয়াউর রহমানের নামের প্রথমাংশ ‘জেড’ (Z) অক্ষরের নামানুসারে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম নিয়মিত ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ (Z Force) গঠন করা হয়।
জেড ফোর্সের অধীনস্থ ব্যাটালিয়ন ও পরিচালিত অভিযানসমূহ:
-
১ম, ৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট: এই তিন ব্যাটালিয়নের সুসংগঠিত সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে জেড ফোর্স গড়ে ওঠে।
-
প্রধান যুদ্ধসমূহ: সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, রৌমারী, নকশী এবং জামালপুরের ধানুয়া কামালপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটির বিরুদ্ধে জেড ফোর্স বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ পরিচালনা করে।
-
সামরিক কৌশল: প্রথাগত (Conventional) যুদ্ধনীতি এবং গেরিলা আক্রমণের সংমিশ্রণে জিয়াউর রহমান নির্দেশিত সামরিক অভিযানগুলো পাকিস্তানি বাহিনীকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে সহায়ক হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা, বীরত্ব এবং অধিনায়কত্বের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার জিয়াউর রহমানকে বীরত্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘বীর উত্তম’ প্রদান করে।
চতুর্থ অধ্যায়: স্বাধীনতার পর সামরিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব (১৯৭২–১৯৭৫)
৪.১ সেনাবাহিনী পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক দায়িত্ব
১৯৭১ সালের১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর নবগঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা।
জিয়াউর রহমান ব্রিগেডিয়ার পদে উন্নীত হন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান (Deputy Chief of Army Staff) হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন।
-
পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা: স্বাধীন বাংলাদেশে সেনাবাহিনী গঠনে পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা এবং সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের সংমিশ্রণ ঘটাতে গিয়ে নানাবিধ আদর্শিক ও সাংগঠনিক সংঘাত তৈরি হয়। জিয়াউর রহমান সামরিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও প্রথাগত সেনা কাঠামো ধরে রাখার পক্ষে কঠোর অবস্থান নেন।
-
অরাজনৈতিক অবস্থান (১৯৭২-১৯৭৪): এই সময়কালে তিনি প্রকাশ্যে রাজনীতি থেকে দূরে অবস্থান করেন এবং সেনা ব্যারাকে শৃঙ্খলা বিধান ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালনায় মনোযোগ দেন।
৪.২ ১৯৭২–১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক বছরে বাংলাদেশে খাদ্য সংকট, ৭৪-এর দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বামপন্থী সশস্ত্র রাজনৈতিক দলগুলোর (যেমন জাসদের গণবাহিনী) উগ্র তৎপরতা দেশকে এক অস্থির পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে সরকার রক্ষীবাহিনী গঠন করে, যা সাধারণ সেনাবাহিনী এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ ও সন্দেহের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের সূচনায় চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাকশাল’ (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ) প্রবর্তন করা হয়। এই রাজনৈতিক রূপান্তর সামরিক বাহিনীর পেশাদার অংশ ও সাধারণ নাগরিকদের অনেকের মধ্যেই অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।
পঞ্চম অধ্যায়: ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস
৫.১ ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমানের অবস্থান
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর কিছু জুনিয়র অফিসারের সামরিক অভ্যুত্থানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর পরিবারসহ নির্মমভাবে নিহত হন। একই দিন খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের দাবি ও নিরপেক্ষ তথ্য:
১. জিয়াউর রহমানের অবস্থান: অভ্যুত্থানের সময় তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেনা আইন অনুযায়ী তিনি সরাসরি চেইন অফ কমান্ডের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ছিলেন না (তৎকালীন সেনাপ্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ)।
২. অভিযোগ ও সমালোচনা: সমালোচকদের (বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত গবেষক ও নেতাদের) দাবি—১৫ আগস্টের প্লট বা ষড়যন্ত্রের কথা জিয়াউর রহমান আগে থেকেই অবগত ছিলেন কিন্তু সেনাপ্রধান বা রাষ্ট্রপতিকে তা অবহিত করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেননি বা তা ঠেকানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেননি।
৩. সমর্থকদের ব্যাখ্যা ও সামরিক নথি: সমর্থকদের দাবি ও সামরিক বিশ্লেষণ হলো—জুনিয়র অফিসারদের এই বিশৃঙ্খলা বা ক্যু চেইন অফ কমান্ড ভেঙে সংঘটিত হয়েছিল। জিয়াউর রহমান এতে সরাসরি অংশ নেননি। মোশতাক সরকার ২৪ আগস্ট সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহকে অপসারণ করে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করে।
৪. ঐতিহাসিক নিরপেক্ষ রায়: আদালতে উত্থাপিত সাক্ষ্য ও বিভিন্ন সেনা কর্মকর্তাদের আত্মজীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জুনিয়র বিদ্রোহীরা জিয়াউর রহমানের সাথে অসন্তোষ নিয়ে কথা বললেও তিনি ক্যু পরিচালনায় সরাসরি নেতৃত্ব দেননি, আবার তা দমন করার ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনীর ভেতরে যে অচল অবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার ফলে কার্যকর সামরিক বাধা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
৫.২ ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলী
৩ নভেম্বরের জেলহত্যা ও খালেদ মোশাররফের ক্যু:
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবহিনীতে আরেকটি অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থান ঘটে।
-
জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় এবং তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে গৃহবন্দী করা হয়।
-
একই দিন ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী চার জাতীয় নেতা (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান)-কে মোশতাক অনুসারীদের হাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
-
খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান হন, তবে তৎকালীন সামরিক কাঠামো ও সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে এতে এক তীব্র প্রতিক্রিয়া ও চরম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
[১৫ আগস্ট ১৯৭৫] ──> বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও মোশতাকের ক্ষমতা গ্রহণ ──> জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান (২৪ আগস্ট)
│
[৩ নভেম্বর ১৯৭৫] ──> খালেদ মোশাররফের ক্যু ──> জিয়া গৃহবন্দী ──> জেলহত্যা
│
[৭ নভেম্বর ১৯৭৫] ──> সিপাহী-জনতার বিপ্লব/সিপাহী বিদ্রোহ ──> জিয়া মুক্ত ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে
৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবস (সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান):
৩ থেকে ৬ নভেম্বরের রাজনৈতিক শূন্যতা ও খালেদ মোশাররফের প্রতি ভারতীয় প্রভাবের গুঞ্জনের প্রেক্ষাপটে অবসরপ্রাপ্ত জাসদ নেতা কর্নেল তাহের ও ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র উদ্যোগে ৭ নভেম্বর গভীর রাতে ঢাকা সেনানিবাসে সেনা বিদ্রোহ শুরু হয়।
-
সাধারণ সৈনিকেরা বিদ্রোহ করে খালেদ মোশাররফ ও তাঁর সহযোগীদের হত্যা করে (বা নিহত হন)।
-
সৈনিকেরা বন্দীদশা থেকে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করে কাঁধে তুলে নেয়।
-
সেনানিবাসের বাইরে সাধারণ জনগণ রাজপথে নেমে আসে এবং এ ঘটনা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বা ‘সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান’ নামে পরিচিতি পায়।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একক ও প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে আবির্ভূত হন।