বরগুনার ডাকবাংলোর পৃথক দুটি কক্ষ থেকে মা ও দুই মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, মা ইতি রানী (৩৪) তার মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস (১২) ও অনুরাধা বিশ্বাসকে (৩) হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন বিভিন্ন এনজিও ও মানুষের কাছে ৪ লাখ টাকার বেশি ঋণের কারণে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে বরগুনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মুকিত হাসান খান।
পুলিশ জানায়, প্রায় ১৫ বছর আগে বরগুনা পৌরসভার কড়িতলা এলাকার বাসিন্দা দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে ইতি রানীর বিয়ে হয়। তাদের দাম্পত্য জীবনে দুই কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস পেশায় দর্জির দোকানের পাশাপাশি ছোট সুপারি ব্যবসা চালাতেন। তবে তার ব্যবসার সীমিত আয়ে পরিবারের দারিদ্র্য মেটাতে পারেননি। পরে বৈবাহিক অবস্থা ও স্বামীর ব্যবসার উন্নতির জন্য স্থানীয় পাঁচটি এনজিও থেকে ২ লাখ ২৭ হাজার ৭২৩ টাকা ঋণ নেন ইতি রানী। এ ছাড়া স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস একটি এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং পৃথক দুই ব্যক্তির কাছ থেকে আরও ১ লাখ টাকা ধার নেন। এ হিসাব অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রী উভয়ের নামে মোট ৪ লাখ ৭ হাজার ৭২৩ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।

তবে অধিকাংশ এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি যথাসময়ে পরিশোধ করা হলেও ঋণের সব টাকা পরিশোধ করা নিয়ে মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগছেন ইতি রানী। আর এ কারণে পারিবারিক আয়ে স্বামীর ব্যবসায় সহায়তা করতে জেলা পরিষদের ডাকবাংলায় পরিচ্ছন্নতার চাকরি নেন তিনি। পরে বিভিন্ন এনজিওর কাছ থেকে নেওয়া ঋণের কারণে হতাশা থেকে ইতি রানী আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জানা যায়, ঘটনার দুই মাস আগে থেকে জেলা পরিষদের ডাকঘর বাংলোর পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করেন ইতি রানী। এরপর ৩ জুন রাত ১১টার দিকে দুই মেয়েকে নিয়ে ডাকবাংলোতে যান। পরে ওই দিন দুপুরে ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার একটি কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে অন্য শ্রমিকরা পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে একটি কক্ষ থেকে বড় মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাসের মরদেহ এবং তালাবদ্ধ ঘর থেকে মা ইতি রানী ও ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের মরদেহ উদ্ধার করে। তবে একই সময়ে মা ও দুই মেয়ের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়, যা হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।
পরে গত ৯ জুন মারা যাওয়া ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বাদী হয়ে বরগুনা থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। দায়ের করা মামলার তদন্তের পর পুলিশ প্রমাণ পায় ইতি রানী ও তার স্বামী বিভিন্ন এনজিও ও মানুষের কাছে ঋণের বোঝা। আর এ কারণে মা ইতি রানী তার মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস ও অনুরাধা বিশ্বাসকে মানসিক অবসাদে হত্যার পর নিজেও আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মুকিত হাসান খান বলেন, ভুক্তভোগী ইতি রানীর স্বামীর কোনো জমিজমা নেই, ছেলে নেই। স্বামীর আর্থিক স্বচ্ছলতার অভাবে ইতি রানী বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে মানসিক যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়েন। এ কারণেই তিনি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। মামলাটি তদন্তাধীন।
পুলিশ সুপার জানান, খুব শিগগিরই আদালতে পুলিশের প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।