ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কোনো মূল্য নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক দলের (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, এই সংসদে বিরোধী দলের বক্তব্য বা জনগণের কণ্ঠের কোনো মূল্যায়ন নেই।
এটি এখন বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে পরিণত হয়েছে। এমন অবস্থায় সংসদ পাঁচ বছর টিকবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে লিফলেট বিতরণ ও গণযোগাযোগ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের ১৬ বছর পর নতুন জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে এবং এই সংসদের মূল্য দুই আনাও নয়। এই জাতীয় সংসদ পাঁচ বছর টিকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ এই সংসদে বিরোধী দলের কথার কোনো মূল্যায়ন নেই। মানুষের কণ্ঠের মূল্য নেই। এই জাতীয় সংসদ বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের সংসদে পরিণত হয়েছে। এটা জাতীয় সংসদ, জনগণের কোনো জাতীয় সংসদ নেই।’
সংসদে জনগণের কথা বলার সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ‘আমরা মনে করি, আপনার পক্ষে কথা বলার জন্য আপনি আমাদের সংসদে পাঠিয়েছেন। সেখানে কথা বলতে না পারায় আমরা আবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। আমরা আবার আপনার কাছে এসেছি।’
বর্তমান সরকারকে ‘জনগণের অভ্যুত্থানের ইচ্ছার পরিপন্থী’ আখ্যা দিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘সরকার এমন একটি সরকার যা জনগণের অভ্যুত্থানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। বিএনপি যারা বর্তমান সরকারে থাকলেও তারা তখন গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে ছিল। ছাত্রদলের অনেক নেতা আহত ও নিহত হন। কিন্তু গত ১৬-১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক নেতাদের বিরোধ ছিল। ফলে আমরা দেখেছি তাদের নেতাদের মধ্যে পরিবর্তনের কোনো ইচ্ছা নেই। গত ৭-৮ মাসে তাদের কোনো পরিবর্তন হয়নি।’
গণভোট ও জুলাইয়ের সনদ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘২০২৬ সালের নির্বাচনে আপনারা দুইবার ভোট দিয়েছেন। একটি গণভোট, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আরেকটি ভোট। আপনি এবং আমি সবাই সেই গণভোটে হ্যাঁ ভোট দিয়েছি। আমরা বললাম হ্যাঁ পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রতীক। কিন্তু আপনারা দেখেছেন, নির্বাচনের পর যারাই ক্ষমতায় এসেছেন- তারা জুলাই সনদকে অবজ্ঞা করেছেন, গণভোট অস্বীকার করেছেন। গণঅভ্যুত্থানকে অস্বীকার করে তারা গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের সাথে প্রতারণা করেছে।’
বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে বিরোধী দলের চিফ হুইপ বলেন, ‘বিএনপি সরকারকে আমরা জুলাই গাদ্দার সরকার বলতে পারি। যারা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ভুলে বাংলাদেশকে নিয়ে গেল পুরনো বন্দোবস্তে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে, সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে, দেশে বৈষম্য দূর না হলে, চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস দূর না হলে বাংলাদেশের মানুষ বলতে শুরু করেছে শেখ হাসিনার কী দোষ।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘কারণ তারেক রহমান ও শেখ হাসিনার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। শেখ হাসিনার মতো তারেক রহমানও এখন অবৈধভাবে ক্ষমতায়। তারেক রহমান জনগণের ভোটাধিকার, গণভোটের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছেন। তারা নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেশকে মাফিয়াদের হাতে তুলে দিয়েছে। আমরা আজ সারা দেশে তার উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি।’
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে এলপিজি গ্যাসের দাম ১ হাজার ৮০০ টাকা। কিন্তু খুচরা বাজারে গেলে কিনতে হয় ২৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকায়। নির্বাচনের পরও তা ছিল ১ হাজার ২০০ টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতি ছিল, পুলিশ ছিল নাজুক অবস্থায়। কিন্তু সে সময় সব শিক্ষার্থী মাঠে থাকায় দেশের পরিস্থিতি তেমন খারাপ ছিল না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছেন। আজ সকালে আমরা গায়ক আসিফ আকবরের গাড়ি ভাংচুরও দেখেছি। অর্থাৎ, আপনি সমাজের যে স্তরেরই হোন না কেন, এই অবস্থায় আপনি নিরাপদ নন। এই সরকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ।’
মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজিতে বিএনপি নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘সবচেয়ে বড় মাদক সিন্ডিকেট ও হটস্পট বিএনপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে বিএনপির প্রতিমন্ত্রী যতই বন্দুক নিয়ে বের হন না কেন, বিএনপি সরকারের পক্ষে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়।’
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি, আমাদের পরিবহন সেক্টরে নির্বিচারে চাঁদাবাজি হচ্ছে। এই সয়দাবাদ-যাত্রাবাড়ী এলাকায় প্রতিটি বাস, প্রতিটি রুটের যানবাহনে ভাড়া আদায় করা হয়। এই অবদান কোথায় যায়? আওয়ামী লীগ এখনও এই অবদানের একটি অংশ পায়, এবং আমাদের নতুন বিএনপি একটি অংশ পায়।
‘আওয়ামী লীগ বিভাজন করে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের পকেট থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে দেশে এই সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলতে পারে না। এর জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া, রাজপথে নামা ছাড়া বিকল্প নেই।’
জনগণকে আবার রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘আমরা জানি, আপনারা আন্দোলন করতে করতে ক্লান্ত। আপনি গত 16 বছর ধরে আন্দোলন করছেন। আমরা আপনাকে রাজপথে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে। তারেক রহমান গণঅভ্যুত্থান ঘটান। সেই গণ-অভ্যুত্থানকে ফিরিয়ে আনতে রাজপথে নামা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই।’