খুলনা মহানগরীসহ গোটা জেলায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডে ভেঙে পড়ছে প্রতিটি পরিবার। দুষ্কৃতীদের গুলিতে একজন সন্তান হারালো বাবা, স্ত্রী হারালো প্রিয় স্বামী, বোন হারালো ভাই, বাবা-মা হারালো দুষ্কৃতীদের গুলিতে প্রিয় সন্তান। এক সময়ের শান্তিপূর্ণ নগরী খুলনায় চলছে খুন, চাঁদাবাজি ও বন্দুকযুদ্ধের মহোৎসব।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরে খুলনা মহানগরীসহ জেলায় ৭৫টি খুনসহ অসংখ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। হত্যাকাণ্ড থেকে বাদ নেই নারীরাও। গত সোমবার বিকেলে শহরের অদূরে রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের আটরোবাঁকি নদী থেকে সোহাগ ও রেজাউল করিম নামে দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগের দিন রোববার সন্ধ্যায় খুলনা মহানগর তাঁতীদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবিরকে নগরীর রায়েরমহলে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ নভেম্বর পর্যন্ত শুধু খুলনা মহানগরীতেই দুর্বৃত্তদের হাতে নারীসহ ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই তরুণ। কেএমপি সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারিতে একজন, ফেব্রুয়ারিতে চারজন, মার্চে চারজন, এপ্রিলে দুইজন, মে মাসে তিনজন, জুনে তিনজন, জুলাইয়ে তিনজন, আগস্টে পাঁচজন, সেপ্টেম্বরে ছয়জন, অক্টোবরে চারজন এবং নভেম্বরে দুইজন খুন হয়েছেন।অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় চারটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশ হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ১৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করে।
22টি সন্ত্রাসী সংগঠন, ডাকাত ও কিশোর চক্রের প্রভাবে মানুষ
খুলনা মহানগরীতে পুলিশের তালিকাভুক্ত ২২টি সন্ত্রাসী সংগঠন ও কিশোর গ্যাং রয়েছে। এই সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো হলো রনি চৌধুরী ওরফে বাবু চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নেতৃত্বে ‘বি’ কোম্পানি, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, গোল্ডেন বয়েজ, টিপসি বয়েজ, কিং অব রূপসা, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, ডেঞ্জার বয়েজ, টেঙ্কি শাওন গ্রুপ, আরমান ওরফে শাকিন গ্রুপ, স্টার নাইন গ্রুপ, স্টার এনটিভি, এনটিভি গ্রুপ। ছেলেরা, রক্ত। বয়েজ, ব্ল্যাক ঈগল, ডার্ক নাইটস, সিন্ডিকেট, চিংড়ি পলাশ গ্রুপ, শিপলু ওরফে রকি গ্রুপ এবং সিনবাদ গ্রুপ। এছাড়াও, শহরের বিভিন্ন পাড়ায় বিভিন্ন উপ-গোষ্ঠী রয়েছে। মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে একদল সন্ত্রাসী আরেকদল সন্ত্রাসীকে হত্যা করছে। এসব গ্রুপের মধ্যে ‘বি’ কোম্পানি গ্রুপের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বেশি। এসব দলকে ভয় পায় সাধারণ মানুষ।
পুলিশের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে খুলনা মহানগরীতে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ ১৫ জন সন্ত্রাসী রয়েছে। তাদের কেউ কেউ কারাগার থেকে তাদের বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে বি কোম্পানির শীর্ষ নেতা রনি চৌধুরী ওরফে বাবু চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবু বোম্বে, ভারত বা মালয়েশিয়া থেকে তার বাহিনী পরিচালনা করছে। সূত্র জানায়, মাদক বিক্রি থেকে গ্রেনেড বাবুর দৈনিক আয় অর্ধকোটি টাকার বেশি।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, কয়েক মাস আগে নগরীর শামসুর রহমান রোডে গ্রেনেড বাবুর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তার বাবা মিন্টু চৌধুরীসহ দুই-তিনজন সহযোগীকে আটক করে প্রায় ৪০ লাখ টাকা জব্দ করা হয়। তিনি বলেন, বাজেয়াপ্ত করা টাকা ছিল ওই দিন দুপুর ২টা পর্যন্ত গ্রেনেড বাবুর মাদক বিক্রি থেকে আয়।
পাশাপাশি চলছে হত্যাকাণ্ড চাঁদাবাজি
খুলনা মহানগরীতে একের পর এক খুনের পাশাপাশি চলছে চাঁদাবাজি। শহরের সরকারি আজম খান কমার্স কলেজের কাছে এক নামকরা চিকিৎসকের কাছে ৩ কোটি টাকা দাবি করেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠন ‘বি’ কোম্পানি। ভয়ে তিনি থানায় কোনো অভিযোগ না দিলেও চেম্বার বন্ধ রেখে আত্মগোপন করেন। এলাকার আরও দুই চিকিৎসক চাঁদাবাজি করে, তারাও আত্মগোপন করেন। গত ৭ অক্টোবর সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে খুলনা সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে মোটা অংকের টাকা দাবি করে। পরে প্রতি মাসে ৩৫ লাখ টাকা দেওয়ার শর্তে পাশ করেন। তবে চাঁদা দাবির বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি। এছাড়া কমার্স কলেজের পাশে অবস্থিত একটি ক্লিনিক থেকে বি কোম্পানি ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। নির্দিষ্ট সময়ে চাঁদা না পেয়ে ক্লিনিক ভাঙচুর করা হয়। পরে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বি কোম্পানির সঙ্গে মোটা অংকের টাকা নিয়ে মীমাংসা করে। শুধু এসব প্রতিষ্ঠানই নয়, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অভিজাত হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসিসহ সরকারি কর্মকর্তারা চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। চাঁদাবাজদের কবল থেকে নিরাপদ নন ইজিবাইক চালক, মুদি ও ফুটপাতের বিক্রেতারা।
গত ২৬ অক্টোবর বিকেলে পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আহসানারা বিনতে আহমেদকে মোবাইল ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেয় আসলাম শিকদার নামে এক ব্যক্তি। টাকা না দিলে যে কোনো জায়গা থেকে তুলে নেওয়ার হুমকি দেয় ওই ব্যক্তি। তাকে ‘টাকা না হয় রক্ত’ দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়। এর একদিন আগে ২৫ অক্টোবর পাইকগাছা উপজেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জিএম আবদুস সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জিএম আক্কাস আলীকে পৃথকভাবে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়।
সন্ত্রাসী–চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ীদের নেপথ্যে কারা গডফাদার??
একের পর এক খুন, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে। খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা প্রসঙ্গে নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হালদার বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বর্তমানে খুলনার মানুষ ক্ষুব্ধ। নগরীর প্রতিটি এলাকায় সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এক পুলিশ কর্মকর্তার ওপরও চাঁদাবাজরা হামলা চালায়। ডাকাতিও বেড়েছে। ডাকাতদের ভয়ে রাতে শহরে চলাচল করতে ভয় পাচ্ছেন মানুষ। কারো জীবনই নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট মমিনুল ইসলাম বলেন, পুলিশ সঠিক ভূমিকা পালন না করা এবং প্রকৃত সন্ত্রাসীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকায় নগরীতে প্রায় প্রতিদিনই খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। তিনি আরও বলেন, এসব গডফাদার ও নেপথ্যের মদদদাতাদের চিহ্নিত না করা পর্যন্ত এক সময়ের শান্তিপূর্ণ নগরী খুলনায় শান্তি ফিরিয়ে আনা যাবে না।
সিটিজেন ফর গুড গভর্নেন্স (সুজন) খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই খুদা ফেসবুকে লিখেছেন, শান্ত ও শান্তির শহর খুলনা এখন উত্তাল। সাধারণ মানুষ এখন আতঙ্কিত। প্রায় প্রতিদিনই খুন, ডাকাতি, জমি দখল, চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) উপ-কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, খুলনায় মাদক সংক্রান্ত অপরাধ বেশি। অনেক ক্ষেত্রে বস্তিতে কিশোরদের দ্বারা অপরাধ সিন্ডিকেট চালানো হচ্ছে। পুলিশ দ্রুত অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করছে।
খুলনা জেলার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, ‘জেলায় সন্ত্রাস দমনে ব্লক রেইড, স্পট রেড ও বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো হচ্ছে। খুলনায় সব খুন মাদক ব্যবসা দিয়ে সংগঠিত হচ্ছে। মাদকের স্পটগুলোতে অভিযান চালানো হচ্ছে। আসামিরা যাতে দ্রুত জামিন না পান সেজন্য বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে। দ্রুত সকল সন্ত্রাস দমন করে খুলনাকে শান্তির শহরে পরিণত করা হবে।’