সাজেক সড়কে অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, লাঠিপেটা ও ভাংচুরের প্রতিবাদে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে ইউপিডিএফ সমর্থিত ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদ।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভোর থেকে শুরু হওয়া এ কার্যক্রম চলবে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। তবে অবরোধে দুই জেলার অবস্থা এক নয়। খাগড়াছড়িতে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও রাঙামাটি শহর ও চট্টগ্রাম রুটে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। নৌপথেও অবরোধের তেমন প্রভাব পড়েনি।
শনিবার সকালে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের চেঙ্গী সেতু, স্বনির্ভর এলাকা, খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের কৃষি গবেষণা এলাকা এবং গুইমারা জোড়াব্রিজ এলাকায় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের সাপমারা এলাকায় গাছ কেটে সড়ক অবরোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রধান সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে টায়ার ও খড়কুটো জ্বালিয়ে পিকেটিং করা হয়। দীঘিনালা-সাজেক সড়কের মাচালংসহ বিভিন্ন স্থানে অবরোধকারীদের বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে।
অবরোধের কারণে দূরপাল্লার কোনো বাস খাগড়াছড়ি ছেড়ে যায়নি। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু অটোরিকশা চলাচল করতে দেখা গেছে। পুলিশি পাহারায় ঢাকা থেকে রাতের বাস খাগড়াছড়ি পৌঁছায়।

খাগড়াছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কে কিসলু বলেন, ঢাকা থেকে রাতের বাসগুলো পুলিশি পাহারায় শহরে আনা হয়। ঢাকা থেকে আসা কয়েকটি বাস দেরি হওয়ায় রামগড়ে অবস্থান করছে। তাদের দুপুর ১২টার পর খাগড়াছড়িতে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পিকেটাররা শহরের কয়েকটি স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের ধাওয়া দেয়। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
অন্যদিকে রাঙামাটি জেলা শহরের বনরূপা ও কল্যাণপুর বাজারসহ অভ্যন্তরীণ সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। শনিবার বাজারের দিন হওয়ায় শহরের বিভিন্ন সড়কে স্বাভাবিক ব্যস্ততা দেখা গেছে। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি-বান্দরবান সড়কেও যানবাহন চলাচল করছে। তবে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে সাপছড়ি খামারপাড়া ও কুতুকছড়ি ধরমগড় এলাকায় পিকেটিং করায় গাছের গুঁড়ি নিক্ষেপ ও আলো জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিক্ষোভকারীরা কুতুকছড়ি আধা বাজার থেকে মাজার পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল বের করে।
রাঙামাটি-চট্টগ্রাম বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইউছুপ জানান, চট্টগ্রাম রুটে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও অবরোধের কারণে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
রাঙামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির লাইনম্যান বিশ্বজিৎ দে জানান, অবরোধের কারণে নৌপথে কোনো প্রভাব পড়েনি। রাঙামাটি থেকে বাঘাইছড়ি, মাইনি, জুরাছড়ি ও বরকল পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ও কাউখালী উপজেলার ফটিকছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উষাতন চাকমা বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করছি। তবে কাউখালীর বেতবুনিয়া এলাকায় পিকেটিং চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের কর্মীদের বাধা দেয়। কাউখালী-ঘাগড়া হয়ে রাঙামাটি সড়কে অবরোধ শান্তিপূর্ণভাবে চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
রাঙামাটি কোতয়ালী থানার ওসি মো. জসিম উদ্দিন ও কাউখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী জানান, অবরোধে এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

এদিকে সাজেক থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানান, সাজেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। পিকেটিং-এর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু কোনো যানবাহন চলাচল করছে না।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মল চাকমা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে শনিবারের অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সাজেক সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে হামলা, লাঠিচার্জ ও ভাংচুরের বিরুদ্ধে সাজেকবাসীর দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে এ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। সংগঠনের সভাপতি উষাতন চাকমা অবরোধ সফল করতে পার্বত্য চট্টগ্রামের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠন এবং রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির যানবাহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের সহযোগিতা কামনা করেন। তবে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, জরুরি ওষুধের যানবাহন এবং সাংবাদিকদের অবরোধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এর আগে তিন দফা দাবিতে সাজেক পর্যটন সড়ক অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ডাক দেয় সাজেক জনগণের অধিকার সংরক্ষণ কমিটি ও সাজেক গাড়িবাড়ি অ্যাসোসিয়েশন। তাদের অন্যতম দাবি ছিল সাজেক এলাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সোসাইটির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের প্রত্যাহার করা। তবে জেএসএস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংগঠনের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজিব চাকমা বলেন, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানি আড়াল করতেই এমন অভিযোগ করা হচ্ছে।
বুধবার সাজেক জনগণের অধিকার সংরক্ষণ কমিটি ও কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঘোষণা করে পর্যটকদের সাজেক ত্যাগের আহ্বান জানায়। নিরাপত্তা হুমকির কথা বিবেচনা করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাময়িকভাবে সাজেক পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করে এবং বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে পর্যটকদের সাজেক ত্যাগের নির্দেশ দেয়। নির্দেশনা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই সাজেক ছাড়তে শুরু করেন পর্যটকরা। তবে উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়েন তারা। পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে আইন প্রয়োগকারীরা হস্তক্ষেপ করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। ওই দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে অবরোধকারীদের সংঘর্ষ হয় এবং বাহিনী ও ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়।