তাহসিফের মৃত্যু: দুই গ্রেফতারে তদন্তে নতুন মোড়

Adc4ac0db364bfa1c1720f457745de5c 6ae74342b9e19 Adc4ac0db364bfa1c1720f457745de5c 6ae74342b9e19
Adc4ac0db364bfa1c1720f457745de5c 6ae74342b9e19

উত্তরার একটি রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল তিনজনের একসঙ্গে প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। তাদের একজন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। অন্য দুজন তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ এবং তার কথিত এক বান্ধবী। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাতে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কী ঘটেছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পরদিন বিকালে তুরাগ নদে পাওয়া যায় তাহসিফের মরদেহ।

কয়েক দিনের ব্যবধানে দীপের পর শনিবার রাতে সেই তরুণীকেও গ্রেফতার করেছে নৌপুলিশ। দুজনই এখন চার দিনের রিমান্ডে। কিন্তু শেষ রাতে তাহসিফ কোথায় গিয়েছিলেন, কেন গিয়েছিলেন, কারা তার সঙ্গে ছিলেন এবং কীভাবে তার মৃত্যু হলো— এসব প্রশ্নের জবাব জানতে চাইলে নৌপুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।

তবে তদন্তে উঠে আসা নতুন তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও সন্দেহভাজনদের বক্তব্যের অসংগতি ঘিরে ক্রমেই জটিল হচ্ছে মৃত্যুরহস্য। দীপের দাবি, পুলিশের মতো দেখতে দুজনকে দেখে তারা দৌড় দিয়েছিলেন। এরমধ্যে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, আর তিনি পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। আর গ্রেফতার তরুণীর দাবি, ঘটনার আগেই তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।

সংশ্লিষ্টরা জানান, একদিকে ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ দেওয়া দীপের বক্তব্যের সঙ্গে তদন্তে পাওয়া তথ্যের গরমিল, অন্যদিকে সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত হওয়া তরুণীর উপস্থিতির বিষয়ে দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা। নৌপুলিশ বলছে, তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সেসব তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বা দায়ীদের বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

তরুণীর গ্রেফতারে তদন্তে নতুন মাত্রা

তদন্তে সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে সেই তরুণীকে (১৯) গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে রাজধানীর কাফরুল এলাকায় নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে নৌপুলিশ। রবিবার (১ নভেম্বর) তাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রিপন হোসেন চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে শনিবার দীপকেও চার দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত।

পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার আগে তাহসিফের সঙ্গে গ্রেফতার তরুণীর চলাফেরার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের উত্তরার নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে যাওয়ার পাশাপাশি সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকস এবং একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে অবস্থানের তথ্যও তদন্তে এসেছে। তাহসিফের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে সেই তরুণীর সঙ্গে একাধিকবার ফোনে কথা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি পুলিশের।

তদন্ত কর্মকর্তা আবেদনে তরুণীকে জিজ্ঞাসাবাদের ছয়টি কারণ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মৃত্যুরহস্য উদঘাটন, অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিদের শনাক্ত, আলামত উদ্ধার, সম্ভাব্য ঘটনাস্থল নির্ধারণ এবং সেই তরুণী ও দীপের বক্তব্যের মিল অমিল যাচাই। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে তরুণীর সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে আদালতে রিমান্ড আবেদনের বিরোধিতা করেন গ্রেফতার তরুণীর আইনজীবী শাহরিয়ার রহমান সিহাব। তার দাবি, ঘটনার রাতে প্রায় ১২টার দিকে ওই তরুণীকে বাসায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপরও তাহসিফ তার মাকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। ওই বার্তায় তাহসিফ তখন জীবিত ছিলেন বলে যুক্তি দেন আইনজীবী। কেবল রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজে উপস্থিতির ভিত্তিতে ওই তরুণীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার বিষয়টি আরও যাচাই করা প্রয়োজন বলেও আদালতে তুলে ধরেন তিনি। দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তদন্তে সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের করবী ভবনের গ্যারেজে মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশ করেন দীপ। কিছুক্ষণ পর তাহসিফ নিচে নামেন। সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে তাদের বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।

এরপর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে তাহসিফের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়। সিসিটিভি ফুটেজের বর্ণনা অনুযায়ী, তার সঙ্গে ছিলেন গ্রেফতার তরুণী। পরে পৃথক মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছান দীপ। রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তিনজনকে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।

রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গ্রেফতার তরুণীকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর দিকে যান। বিশেষ করে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পৌঁছানোর আগে তারা কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না এবং ওই এলাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

দীপের বক্তব্যে অসংগতি

তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে দীপের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। ঘটনার পর সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছিলেন, উত্তরার একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খাওয়ার পর হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হন। এরপর তাহসিফ কোথায় গিয়েছিলেন, তা তার জানা নেই। কিন্তু পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানান ভিন্ন তথ্য। তার এই বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যরাতের পর তিনি তাহসিফের সঙ্গে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে পুলিশের মতো দেখতে দুজনসহ কয়েকজন ব্যক্তিকে দেখে তারা দৌড় দেন। একপর্যায়ে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন বলে দাবি করেন দীপ। অন্যদিকে তিনি নদীর তীরের একটি স্থানে আত্মগোপন করেছিলেন।

তবে দীপের এই বক্তব্যের সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান আগেই জানিয়েছেন, দীপ যাদের পুলিশের সদস্য বলে দাবি করেছেন, তারা আদৌ পুলিশ ছিলেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। তার দেওয়া তথ্যের প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

নৌপুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দীপের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। রিমান্ডে তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

রাত ১টা ৩৫ মিনিটের ‘ভয়েস বার্তা’ গুরুত্বপূর্ণ

তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে তাহসিফের মায়ের কাছে পাঠানো শেষ ভয়েস বার্তাটি। পরিবারের করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, রাতে ছেলে বাসায় না ফেরায় মা বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন। পরে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের ফোন থেকে মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস বার্তা আসে। সেখানে বলা হয়, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি’।

তদন্তে বার্তাটির ডিজিটাল তথ্য, তাহসিফের মোবাইল ফোনের অবস্থানসংক্রান্ত রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বার্তাটি কখন রেকর্ড করা হয়েছিল এবং কখন পাঠানো হয়েছিল, তা নিশ্চিত হলে শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহ আরও স্পষ্ট হতে পারে।

মোটরসাইকেল উদ্ধার, ফরেনসিক প্রতিবেদনের অপেক্ষা

তদন্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে সামনে এসেছে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল। দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত শুক্রবার টঙ্গীর মাজার বস্তি ও নদীর তীরবর্তী এলাকা পরিদর্শন করেন পিবিআই কর্মকর্তারা। সেখান থেকে একটি কালো রঙের সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। মোটরসাইকেলটির সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনার সম্পর্ক, সেটি সর্বশেষ কে ব্যবহার করেছিলেন এবং ঘটনাস্থলে কীভাবে পৌঁছেছিল, সেসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।

এদিকে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার তথ্য রয়েছে। তাহসিফের পাকস্থলী, লিভার, কিডনি ও রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এসব পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে।

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে রাজধানীর উত্তরখান থানায় হত্যা মামলা করেছেন তার বাবা। মামলাটির তদন্ত করছে নৌপুলিশ। পাশাপাশি শুরুতে পিবিআইয়ের সংগ্রহ করা তথ্য ও আলামতও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। সবদিক মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে। তদন্তের এই পর্যায়ে কিছু বলা ঠিক হবে না। তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Keep Up to Date with the Most Important News

By pressing the Subscribe button, you confirm that you have read and are agreeing to our Privacy Policy and Terms of Use
Press Nation Bangladesh
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com