বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুর ঘটনায় রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তার বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর। এরপর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দীপের বক্তব্যে দুই ধরনের তথ্য
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনার দিন তারা দুজন ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেন। পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। অন্যদিকে দীপ সেখান থেকে পালিয়ে আসেন।
তবে আটকের আগে গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া বক্তব্যে ভিন্ন তথ্য জানিয়েছিলেন দীপ। তখন তিনি বলেছিলেন, ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া করেন। পরে দুজন আলাদা পথে চলে যান।
দুটি বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। দীপের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে কাজ করছে পিবিআই।
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার মোটরসাইকেল
দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পিবিআই। তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান রাজধানীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাটের কাছাকাছি টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়।
পিবিআই জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে মোটরসাইকেলটি পাওয়া গেছে। তবে এটি তাহসিফের কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেলটি তাহসিফের হতে পারে বলে ধারণা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মোটরসাইকেলটি কীভাবে সেখানে পৌঁছাল এবং ঘটনার সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কী বলছে পিবিআই
এ ঘটনায় দীপের বক্তব্যসহ জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান।
তিনি জানান, দীপের দেওয়া তথ্যের পাশাপাশি অন্যান্য আলামতও পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে পাওয়া তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখছেন কর্মকর্তারা।
বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ তাহসিফ
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। ওই দিন দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে মুঠোফোনে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান তিনি। সেখানে বাসায় ফিরছেন বলে জানান।
কিন্তু এরপর আর বাসায় ফেরেননি তাহসিফ। পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সন্ধান পাননি।
পরদিন বুধবার বিকেলে রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজে দীপের উপস্থিতি
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা ফুটেজে থাকা ওই ব্যক্তিকে দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন।
এরপর থেকেই তাহসিফের নিখোঁজ হওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনায় দীপের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে নেওয়ার পর তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসছে।
তবে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, কীভাবে তিনি তুরাগ নদে গেলেন এবং ঘটনার সময় সেখানে আসলে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। মোটরসাইকেল উদ্ধার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং দীপের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের সূত্র ধরে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পিবিআই।