কক্সবাজারে পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে আনন্দের ছুটি কাটাতে গিয়ে আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন। তাদের মধ্যে একই পরিবারের তিনজনসহ নিকটাত্মীয় ছয়জন রয়েছেন। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটাপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে শিশু ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রয়েছে। এ ঘটনায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরও সাতজন। কেউ কেউ এখনো নিখোঁজ। জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জন হলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের ছাত্রী লায়লা জাহান নাবিলা, তার তিন বোন ফারিয়া কবির (৩৩), ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্রী মিলিতা মেহজাবিন আলভি (২৩), ৫ বছরের ভাতিজা ফাইজান নূর। নাফিজ তেহামি নূর নাবিলার বড় বোন ফারিয়ার ছেলে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ছাত্রী। নিহত নাফিজ, নাবিলা, ফারিয়া, মালিহা ও আলভি একে অপরের চাচাতো ভাই। নাফিজের পরিবারের নয় সদস্য কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে রিসোর্টে অবস্থান করেন। তাদের মধ্যে তিনজন বেঁচে যান।
নাসরীন আক্তার মুক্তা (২৯) ঢাকার আশুলিয়ায় স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। ফায়ার সার্ভিস জানায়, নিহত অপর দুই পর্যটকের নাম জিহাদ হাওলাদার ও তরিকুল ইসলাম। তাদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। আরেকজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তার ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে।
আগুন রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়লে এবং এর তীব্রতা বেড়ে গেলে ভেতরে থাকা পর্যটকরা প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে থাকে। কেউ কেউ দরজা-জানালা ভেঙে বেরিয়ে আসেন। কেউ কেউ ভবন থেকে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন।
আহত সাতজনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা হলেন ঢাকা মহানগরীর পশ্চিম রামপুরার শিহাব সাদী (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা (২৯), মিরপুর ১ নম্বর রোডের শিয়ালপাড়ার আব্দুল মান্নান (৩৫), তার স্ত্রী ফাহমিদা (৩২), ঢাকার উত্তরার মোহাম্মদ মাসুদ (৩৩), তার স্ত্রী মেহরুন্নেসা রোমি (৩০) ও ঢাকার দক্ষিণের আশিক (২৮)।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার দোলন আচার্য্য জানান, সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর পান তারা। সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনিম জাহান জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এডিএম আরও বলেন, ‘যেহেতু উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলোর বেশির ভাগই অঙ্গার ছিল, তাই তাদের কয়েকজনকে শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার পর লাশ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
গতকাল সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন পাটুয়ারটেক বিচ রিসোর্টে আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। 3 তলা কাঠের রিসোর্টটি দ্রুত পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর উদ্ধারকর্মীরা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে আহতদের উদ্ধার করে। রান্নাঘরের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। আগুন লাগার পরপরই রিসোর্টের এসি ও সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন পুরো প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, সকাল ৭টার দিকে রিসোর্ট থেকে বিকট শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানো ও উদ্ধারকাজ শুরু করে। দীর্ঘ চেষ্টার পর রাত ১১টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও এসআরবির সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন।
জানা গেছে, কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার দূরে রিসোর্টটির অবস্থান। কাঠের রিসোর্টে মোট 9টি কক্ষ ছিল। রিসোর্টটিতে 16-18 জন পর্যটক থাকতে পারে। এমনকি গতকালও এমন অনেকগুলো পর্যটন স্থান আশা করা হচ্ছে। তবে আগুন লাগার সময় রিসোর্টে কতজন ছিলেন তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানান, প্রথম দফায় আগুন ছড়িয়ে পড়া থেকে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে তল্লাশি চালিয়ে রিসোর্টের টয়লেটে আরও চারজনের লাশ পাওয়া যায়।
এক স্বজন জানান, আগুন লাগার পর তিনি রিসোর্টের দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দিয়ে বেঁচে যান। তবে তার স্ত্রী, স্ত্রীর বোনসহ পরিবারের ছয় সদস্য মারা গেছেন। স্বজন জানান, তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ড সদস্য (সদস্য) শাহাব উদ্দিন জানান, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত টুপটাপ রেস্টুরেন্টটি আমার ওয়ার্ডের পাটুয়ারটেক এলাকায়। বোয়ালখালীর নিয়াজ ও তানভীর যৌথভাবে চট্টগ্রামের আমিরাবাদে ২০ শতক জমি কিনে রেস্টুরেন্টটি নির্মাণ করেন। এর পক্ষে কাউন্সিল থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হলেও বাসস্থান হিসেবে ব্যবসা পরিচালনার জন্য কোনো অনুমতি বা আলাদা ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়নি। রেস্টুরেন্টে একাধিক কক্ষ তৈরি করে পর্যটকদের আবাসন সুবিধা দিয়ে বাড়তি আয় করছিলেন তারা।
কক্সবাজারের ডিসিএমএ মান্নান বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের শিকার রেস্তোরাঁ ও রিসোর্টটি প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই চলছিল। যারা সরকারি জমিতে অবৈধভাবে ব্যবসা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর খবর নেয়নি প্রশাসন।
অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে নির্মিত এই রিসোর্টটি অপসারণের জন্য দুটি নোটিশ জারি করে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে কক্সবাজার এডিএমেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগুনের উৎপত্তি, প্রাণহানির কারণ এবং রিসোর্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে।
এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ১৫তম ব্যাচের ছাত্রী লায়লা জাহান নাবিলা মারা গেছেন। তার মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ রইছ উদ্দিন ও কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর ড. সাবিনা শারমন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন উখিয়া-টেকনাফের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। এ সময় তিনি আগুনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করেন। রিসোর্টের দায়িত্বে মো. সুমন ইসলাম বলেন, আগুন লাগার পরপরই তারা তা নিভানোর চেষ্টা করেন। তবে এয়ার কন্ডিশনার (এসি) ও সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন দ্রুত পুরো প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে।
কামাল উদ্দিন নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, তিনি ঘুম থেকে উঠে রিসোর্টে আগুন দেখতে পান। মুহূর্তের মধ্যেই আগুনে পুড়ে যায় ভবনটি। একই এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম জানান, আগুন লাগার পর কয়েকজন পর্যটককে প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যায়।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে রিসোর্টের মালিক নিয়াজ মোর্শেদ ও তানভীরের অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। গতকাল সন্ধ্যায় সুমনকে আটক করে উখিয়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।