‘লিয়াকত স্যারকে খুব ফিল করি, কোথায় আছেন কেমন আছেন জানি না’

5af53d3ffab52eb699ded3e6c0ddcbdd 6ac271ece9d62 5af53d3ffab52eb699ded3e6c0ddcbdd 6ac271ece9d62
5af53d3ffab52eb699ded3e6c0ddcbdd 6ac271ece9d62

আমার জীবনে শিক্ষকদের নিয়ে স্মৃতিটা একটু জটিল। জটিল এই কারণে যে, আমার বাবা সরকারি চাকরি করতেন। তার চাকরির কারণে আমাদেরও এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো। কোথাও এক বছর, কোথাও দুই বছর। ফলে কোনও একটি জায়গায় দীর্ঘ সময় থাকা হয়নি, কোনও শিক্ষকের সান্নিধ্যেও দীর্ঘদিন থাকার সুযোগ হয়নি।

আমার পড়াশোনা শুরু হয়েছিল যশোরের নড়াইলে। তখন নড়াইল যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপর টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জায়গায় পড়াশোনা করেছি। প্রায় ১০ থেকে ১২টি স্কুল-কলেজ বদলেছি। তাই এককভাবে কোনো একজন স্কুলশিক্ষকের প্রভাব আমার জীবনে কতটা ছিল, সেটা হয়তো বলতে পারবো না। কিন্তু এর বাইরেও আমার জীবনে একজন শিক্ষক ছিলেন, যিনি আমার কোনও স্কুলের শিক্ষক ছিলেন না। আমাদের সঙ্গেই থাকতেন। অনেকটা আগে যেটাকে ‘লজিং’-এর মতো বলা হতো, সেভাবেই তিনি আমাদের বাসায় থাকতেন। তার নাম মিস্টার লিয়াকত আলী। তিনি একজন বিএসসি শিক্ষক ছিলেন। আমি যে স্কুলে পড়তাম, তিনি সেই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন না। কিন্তু আমার জীবনে তার প্রভাব সম্ভবত কোনো কোনো স্কুলশিক্ষকের চেয়েও বেশি।

আজ আমি যে আমি, আমার মধ্যে যে যুক্তিবোধ, যুক্তির প্রতি যে আগ্রহ, মুক্তচিন্তার যে জায়গাটা; আমার মনে হয়, এসব অনেকটাই আমি আমার লিয়াকত স্যারের কাছ থেকে পেয়েছি। তিনি আমাকে ক্লাসে পড়াননি। কিন্তু ক্লাসের বাইরে আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও মাঝেমধ্যে তার সঙ্গে আমার দেখা হতো। তখন তিনি ঢাকায় এসে স্কুলে শিক্ষকতা ছেড়ে সরকারি চাকরি করতেন মৎস্য বিভাগে। তিনি মৎস্য ভবনে আসতেন। আর আমার হল ছিল সেখান থেকে কাছাকাছি দূরত্বে। ফলে দেখা হয়ে যেতো, কথা হতো। সেই সময়গুলো এখন আরও বেশি মনে পড়ে।

আমি এখনও মনে করি, আমার জীবনে যত কিছু ভালো আছে, যত কিছু লজিক্যাল আছে, কোনো বিষয়কে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার যে সক্ষমতা যতটুকু তৈরি হয়েছে, তার পেছনেও লিয়াকত স্যারের অবদান আছে। তাই তাঁকে আমি খুব ফিল করি।

ইদানীং আরও বেশি ফিল করি। কারণ আসলে তাঁকে আমি হারিয়ে ফেলেছি। তিনি এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন, আদৌ আছেন কিনা; কিছুই জানি না। উনার বাড়ি ছিল জামালপুরের নান্দিনায়। ওদিকে আমার কখনও যাওয়া হয়নি। তাঁর খোঁজও নেওয়া হয়নি। সময়ের সঙ্গে যোগাযোগটা হারিয়ে গেছে। অথচ মানুষটা আমার জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গাজুড়ে আছেন।

কখনও কখনও ভাবি, মানুষ তার জীবনে যাদের কাছ থেকে কিছু পেয়েছে, তাদের সবাইকে কি শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়? হয়তো যায় না। কিন্তু কাউকে ভুলে যাওয়া আর কাউকে খুঁজে না পাওয়া এক কথা নয়। আমি স্যারকে ভুলতে পারি না। কোনও কারণে যদি এই ভিডিও তার পরিচিত কারও চোখে পড়ে, তারা যদি আমাকে তাঁর খবরটা দেন, আমি খুবই কৃতজ্ঞ থাকবো। আমি জানতে চাই, লিয়াকত স্যার কোথায় আছেন। কেমন আছেন। তিনি পৃথিবীতে আছেন কি না, সেটাও জানতে চাই।

তিনি আমার ক্লাসে আমাকে শেখাননি। কিন্তু ক্লাসের বাইরে আমাকে শিখিয়েছেন। আমার চিন্তার ভেতরে যুক্তির যে জায়গাটা, মুক্তভাবে ভাবার যে অভ্যাস; সেখানেও তাঁর ছাপ আছে। তাই আজ তাঁকে মনে করে শুধু এটুকুই বলতে চাই—স্যার, আপনি যদি পৃথিবীতে থাকেন, তাহলে ভালো থাকবেন। এই দোয়া রইল। কারণ বয়স তো হলো, আমারও তো অনেক বয়স হয়েছে।

আর যদি পৃথিবীতে না থাকেন, তাহলে যেখানেই থাকেন, শান্তিতে থাকেন। আপনার একজন ছাত্র আপনাকে এখনো মনে রেখেছে। আপনি যেন অন্তর থেকে সেটা উপলব্ধি করতে পারেন।

—সিনিয়র সাংবাদিক

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Keep Up to Date with the Most Important News

By pressing the Subscribe button, you confirm that you have read and are agreeing to our Privacy Policy and Terms of Use
Press Nation Bangladesh