চলতি বছরের অক্টোবর মাসে সারাদেশে রাজনেতিক সহিংসতা, দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলে ১২ জন নিহত এবং ৩৩৪ জনের বেশি বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন।
শনিবার (৩ নঅভেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি–এইচআরএসএস।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে অক্টোবর মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ৭০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৩৪ জন। সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় অক্টোবর মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা কমলেও ঘটনা ও নিহতের সংখ্যা বেড়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে কমপক্ষে ৬৮ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৪ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫২৭ জন।
অক্টোবর মাসে সহিংসতার অন্তত ৭০টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৩৫টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৮৫ জন ও নিহত ৯ জন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ৬টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬ জন, বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ৭টি সংঘর্ষে আহত ২৭ জন ও নিহত হয়েছেন ২ জন।
আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দলে ১টি ঘটনায় ১ জন, বিএনপি-এনসিপি মধ্যে ০২টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ০৩ জন, বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে ১১টি সংঘর্ষে ৩৩ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ৮টি ঘটনায় আহত হয়েছে ৭০ জন। নিহত ১২ জনের মধ্যে বিএনপির ১০ জন ও আওয়ামী লীগের ২ জন।
এছাড়া আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা ও হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এ মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক ৬টি সহিংসতার ঘটনায় ৩৫ জন আহত ও ১ জন নিহত হয়েছেন।
এরমধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৪টি ঘটনায় ৩১ জন আহত ও ১ জন নিহত এবং অন্যন্য দলের মধ্যে সহিংসতার ২টি ঘটনায় ৪ জন আহত হন।
আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় ও অন্তকোন্দল, ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১১টি ঘটনায় ৬ জন আহত এবং ৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপি ২ জন, আওয়ামী লীগের ৪ জন ও চরমপন্থী একজন। এছাড়া অন্তত ৩১ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাকেন্দ্রিক ২২টি ঘটনায় অন্তত ৭০টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
রাজনৈতিক নেতাকর্মী আটক ও মামলার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে ২৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ২০২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ৩১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
এছাড়া একই মাসে রাজনৈতিক, যৌথ অভিযান ও বিশেষ অভিযানসহ অন্যান্য মিলিয়ে অন্তত ২৫ হাজার ১৬৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৩৮৪ জন নেতাকর্মী, বিএনপির ৮১ জন, জামায়াতে ইসলামির ২৭ জন, এনসিপির ১ জন এবং উগ্রপন্থী ও চরমপন্থী সংগঠনের ১৮ জন সদস্য রয়েছেন।
গণপিটুনী ও মব সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অভিযোগে গণপিটুনীর ৩৩টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ২২ জন এবং আহত হয়েছেন ২০ জন।
অপরদিকে মব সহিংসতায় ২২টি ঘটনায় ৩৬ জন আহত ও ১ জন নিহত হয়েছেন। এসময়ে মব সহিংসতার ঘটনায় ২ জনকে হেনস্থা, ৬ জন পুলিশ সদস্য আহত, ৭টি বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
অক্টোবর মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এ মাসে অন্তত ২৮টি নির্যাতনের ঘটনায় কমপক্ষে ৪৬ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় একজন নিহত, আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৩১ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৭ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৬ জন সাংবাদিক। এছাড়া সংবাদ প্রকাশের জেরে মানহানির ইস্যুতে ১টি মামলায় ১ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সভা সমাবেশ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে ৯ টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, এতে ১০৮ জন আহত, ৪ জন গুলিবিদ্ধ ও ৩১ জন আটক হন।
এছাড়া, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনায় এমাসে অন্তত ১৫টি ঘটনায় ২০ জনকে আটক ও ১৫টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ২০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনায় ২টি ঘটনায় ৩ জনকে আটক ও ২টি মামলা হয়েছে।
এছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে সমালোচনায় ৪ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটূক্তির অভিযোগে ৫ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ৬ জনকে আটক করা হয়েছে।
অক্টোবরে জুলাই ইস্যু, মাদক, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ধর্মীয় অবমানাসহ নানা বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১ জনকে পিটিয়ে হত্যা, ৩ জন নির্যাতন, ১ জনকে সাময়িক চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ১টি মামলায় ১ জনকে আটক ও ২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বিচার বহির্ভূত হত্যা, ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ১৯ জন আসামি মারা গিয়েছেন। এর মধ্যে ৪ জন কয়েদী ও ১৫ জন হাজতি। মৃত ১৯ জনের মধ্যে ২ জন আওয়ামীলীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের এবং বাকি ১৭ জন সাধারণ কয়েদী।
এছাড়া এ মাসে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে ও গুলিতে ৩ জন নিহত হয়েছে। ৩ জনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। আটক এড়াতে জুয়া ও মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পুলিশ দেখে দৌড়ে পালানোর সময় ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া মামলার তদন্তের জন্য বাসায় অভিযানের সময় আতঙ্কিত হয়ে স্ট্রোক করে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।
সারাদেশে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে হতাহতের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, অক্টোবর মাসে সারাদেশ নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার ৫৩টি ঘটনায় ৫৫টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে বস্তাবন্দি অবস্থায় ৩টি, ঝুলন্ত অবস্থায় ৪টি, শরীরে একাধিক আঘাতসহ ৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া গলা কেটে হত্যা ৭টি, হাত-পা বাঁধা ৪টি লাশ পাওয়া গেছে। এর বাইরে নানা ধরনের পরিস্থিতিতে আরও ২২টি লাশ পাওয়া গেছে।
সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনা বলা হয়, অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ৩টি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় নিহত হয়েছেন ১ জন এবং আহত হয়েছেন ২ জন, তারা সবাই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ২ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ২ জনের লাশ পাওয়া গেছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির কর্তৃক পুতে রাখা স্থলমাইন বিষ্ফোরণে উখিয়া রোহিঙ্গা শিবিরের এক যুবক আহত হয়েছেন।
সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ৪টি হামলার ঘটনায় ৭টি প্রতিমা ও ৩টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া, এসময়ে একটি ভূমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। শেরপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে পৃথক দুইটি ঘটনায় দুইটি মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মাসে অন্তত ৭১টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৩ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৩৪ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৮ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এছাড়া পৃথক ৩টি ঘটনায় ১ জনের রহস্যজনক মৃত্যূ ও ৩ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ছেন, এর মধ্যে ২ জন শিশু বা কিশোরী। এছাড়া, গৃহকর্মী ৪ জনের মধ্যে ২ জন ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
অক্টোবরে ২৬১ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে ২৬১ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৮২ জন, যাদের মধ্যে ৪২ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ২০ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন ।
ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫ জনকে, এর মধ্যে ১ জন শিশু। এছাড়া ১ জন নারী ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন। অন্যদিকে ৭২ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৩৬ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৯ জন, আহত হয়েছেন ২ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৪৭ জন, আহত হয়েছেন ২৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২১ জন নারী। এছাড়া একজন নারী দাহ্য পদার্থ এসিড নিক্ষেপের মাধ্যম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে, ২০১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৬৩ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।