রংপুরের নিবৃত্তিপল্লীর যুবক জুবায়ের হোসেন উজ্জ্বল, যার হাত-পা অচল এবং কথা বলতে অক্ষম হওয়ার মতো একাধিক শারীরিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তিনি এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। যেহেতু হাত-পা কাজ করে না, মুখ তার শরীরের সবচেয়ে কার্যকরী অঙ্গ হয়ে ওঠে। মুখে কলম ধরে শিক্ষা চলছে। এখন ২৬ বছর বয়সী উজ্জল ব্যস্ততা কাটিয়ে ও প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করে ক্যারিয়ারে নিজেকে উপযোগী করে তুলতে।
মুখে লাঠি দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে উজ্জ্বল। কখনো সে কার্সার নাড়াচ্ছে, কখনো কিবোর্ডে টাইপ করাসহ অনলাইন ও অফিসের বিভিন্ন কাজ শিখছে। অদম্য উজ্জ্বল, যিনি জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, নিজের বিছানাকে ক্লাসরুম বানিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। মুখ দিয়ে বইয়ের পাতা উল্টাতে গিয়ে কলমটা মুখে ধরে চিরকুটে লিখে। এভাবেই সে এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফল করেছে। উজ্জল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চেয়েছিলেন। তবে বর্তমানে সে জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার বালারহাট ডিগ্রি কলেজে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
রংপুর শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে মিঠাপুকুর উপজেলার বালারহাট ইউনিয়নের অজোপাড়া গাঁও হযরতপুর গ্রামের বাসিন্দা উজ্জ্বল শৈশব থেকেই শারীরিক ও বাক প্রতিবন্ধী হয়ে বেড়ে ওঠেন। তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার দৃঢ় ইচ্ছার কাছে আত্মহত্যা করেছিল।
কৃষক পিতা জাহিদ সারওয়ারের তৃতীয় সন্তান উজ্জল অল্প বয়সেই একাধিক প্রতিবন্ধী রোগে আক্রান্ত হন। 10 বছর ধরে শিশুটি উজ্জ্বলকে ডাক্তার, কবিরাজ ও থেরাপিস্টের কাছে নিয়ে যায়। চিকিৎসা চলাকালীন উজ্জ্বলের মুখ থেকে লালা পড়া বন্ধ হওয়া ছাড়া শরীরের কোনো উন্নতি হয়নি। কিন্তু উজ্জ্বলের স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। ছোটবেলায় ছোট বোনকে পড়াতে গিয়ে উজ্জ্বল তার পড়া শুনতেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি উজ্জলকে স্কুলে ভর্তি করেন। সারাদিন ঘরে বসে পড়াশুনা করে উজ্জ্বল। পরীক্ষার সময় বাবা তাকে স্কুলে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে শুইয়ে দেন এবং মুখ দিয়ে পরীক্ষার খাতায় উজ্জ্বল লিখে দেন। এভাবে উজ্জল স্থানীয় শেরপুর বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপি ৪.৩৩ পয়েন্ট পেয়েছে। তারপর 2022 সালে তিনি মিঠাপুকুরের বালারহাট আদর্শ ডিগ্রি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ- 4.58 পেয়েছিলেন।
উজ্জ্বলের বাবা জাহিদ সারোয়ার জানান, করোনার সময় এইচএসসির ফল ঘোষণার আগেই উজ্জ্বলের ছোট বোনের বিয়ে হয়। বড় ভাই একটি এনজিওতে চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে সিলেটে থাকেন। তাই তিনিই এখন উজ্জ্বলের দেখাশোনা করেন। তিনি বেকার হয়ে পড়েছেন। উজ্জ্বলের চিকিৎসা ও লেখাপড়ার খরচ বহন করতে পরিবারটি এখন প্রায় নিঃস্ব। উজ্জ্বলের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর রংপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক নুসরাত ফাতেমা বলেন, ‘উজ্জ্বলের মতো মেধাবীরা পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তারা পরিবারের বোঝা নয়, জনসাধারণের সম্পদে পরিণত হবে।’