বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে ফের তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। এর আগে চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল তাকে। নতুন করে পাওয়া তথ্য যাচাই এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসান শাহাদাত এ আদেশ দেন।
এদিন চার দিনের রিমান্ড শেষে দীপকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। মামলার তদন্তের স্বার্থে তাকে আরও সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিলের পাশাপাশি জামিন আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে দীপের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রথম দফায় সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন।
ঘটনার দিন তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন দীপ
দীপকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেওয়ার আবেদনে পুলিশ জানায়, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার দিন তাহসিফ সৌরিকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ওই সময় দীপ তার সঙ্গে ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ স্বীকার করেছেন, নিহত তাহসিফ সৌরি তার সিনিয়র বড় ভাই ছিলেন। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সংশ্লিষ্টতার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা আবেদনে উল্লেখ করেন, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের পরিচয় এবং ঘটনার আগে-পরে আসামির ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া জামিনে মুক্তি পেলে তিনি তদন্তে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
বন্ধুর ডাকে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ সৌরি। সন্ধ্যা ৬টার পর বাসা থেকে বের হওয়ার পর রাত গভীর হলেও তিনি ফিরে আসেননি।
এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তার মা বারবার ফোনে যোগাযোগ করেন। তখন তাহসিফ কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় ফেরার কথা জানান। পরে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তার ফোন থেকে মায়ের ফোনে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি’।
তবে এরপরও বাসায় ফেরেননি তিনি। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় মরদেহ
২৮ অক্টোবর বিকেল আনুমানিক ৫টা ২০ মিনিটে উত্তরখান থেকে নৌ পুলিশ তাহসিফের পরিবারকে ফোন করে। পুলিশ জানায়, উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
পরে মরদেহটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ময়নাতদন্তের প্রাথমিক কার্যক্রম শেষে ২৯ অক্টোবর দুপুরে নৌ পুলিশ পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে। ওই দিন বিকেলে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
বাবার করা মামলায় গ্রেপ্তার দীপ
ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় গত ৩০ অক্টোবর রাতে রাজধানীর উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম।
মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তার ছেলে। পরে রাত পেরিয়ে গেলেও তিনি আর বাসায় ফেরেননি। পরদিন তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের খবর পায় পরিবার।
এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পরে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আদালতের নতুন আদেশের পর আগামী তিন দিন দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্য এবং তদন্তে পাওয়া আলামত যাচাই করে তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।