শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় তিন ফসলি জমি কেটে অবৈধভাবে পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে এখন কঠোর অবস্থান নিচ্ছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। কৃষি জমি রক্ষা ও অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে কোথাও কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
এদিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার রাতে উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের কাজিপুর গ্রামে অবৈধ পুকুর খননের জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অভিযানে অবৈধ পুকুর খনন ও সরকারি খাল ভরাটের অপরাধে দুদু মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সময়ে খনন যন্ত্র জব্দ করে পুকুর থেকে অপসারণ করা হয় এবং মাটি বহনে ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি যানবাহনের যন্ত্রাংশ অকেজো করে দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলাম সাইফ দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, খবর পেয়ে আমরা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আর্থিক জরিমানা আদায় করি। এই অসাধু চক্রটি পুকুর থেকে সামান্য পরিমাণ মাটিও কেটে ফেললে এবার জরিমানা হবে না, জমির মালিক সরাসরি জেলে যাবেন।
জেলা প্রশাসক ও জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। আমিনুল ইসলাম বলেন, তাড়াশে কৃষি জমি রক্ষায় অবৈধ পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩ কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে। তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান জানান, অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে বিগত বছরের তুলনায় এবার প্রশাসন অনেক বেশি সোচ্চার ও কঠোর।
উপজেলার মাধবপুর, মথুরাপুর, বিডিমাগুরা, চক গোপীনাথপুর, বোয়ালিয়া ও সোলাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা জানান, কিছু অসাধু জমির মালিক নিজেদের স্বার্থে উর্বর জমি কেটে পুকুর নির্মাণ করায় পুরো এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এতে বছরের পর বছর বিস্তীর্ণ মাঠে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং জমি আগাছা ও ঘাসে ভরা। তারা গত সাত বছর ধরে কোনো ফসল ফলাতে না পেরে পরিবার নিয়ে চরম অমানবিক জীবনযাপন করছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিবছর প্রকাশ্যে কৃষি জমি নষ্ট হলেও বিগত বছরগুলোতে প্রশাসন তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারেনি। এর প্রতিবাদে তারা একাধিক মানববন্ধন, প্রতিবাদ মিছিল ও কৃষক সমাবেশ করেছে। তারপরও একটি অসাধু চক্র কৌড়াইল ও সোলাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় গোপনে পুকুর কাটার চেষ্টা করছে।
সিটিজেনস ফর গুড গভর্নেন্স (সুজন) এর তাড়াশ উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক রাজু বলেন, তাড়াশের কৃষি পরিবেশ বাঁচাতে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা খুবই জরুরি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা জানান, তাড়াশের মাটি খুবই উর্বর এবং অধিকাংশ জমিতে বছরে তিনবার ধান ও রেপসিড উৎপন্ন হয়। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি চক্র অন্যায় উপায়ে লাভের জন্য কৃষকদেরকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে পুকুর খননে উৎসাহিত করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে শুধু তাড়াশ উপজেলাতেই সাড়ে চার হাজারের বেশি অবৈধ পুকুর খনন করা হয়েছে, যার ফলে প্রায় ১৩ হাজার বিঘা কৃষি জমি চিরতরে হারিয়ে গেছে।
প্রশাসনের এই সময়োপযোগী ও কঠোর পদক্ষেপের ফলে এবার অবৈধ পুকুর খনন পুরোপুরি বন্ধ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।