বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নিহত তাহসিফ সাউরির (২৮) মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তিনি বলেছেন, দেশে ‘চমৎকার সরকার’ রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা দায়িত্বশীল ও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তাই মামলা করে আদালতে দৌড়াদৌড়ির ঝামেলায় যেতে অনাগ্রহী তারা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ‘মামলার ব্যাপারে আমরা এখনও ভাবিনি। আমরা পারিবারিকভাবে আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত নেবো। তবে মামলার কেন প্রয়োজন হবে? সরকার নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে এবং অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। মামলা মানেই তো আমাদের দেশে একটা ঝামেলা, কোর্টে দৌড়াদৌড়ি। কে চায় এই ঝামেলার মধ্যে পড়তে? যেখানে আমাদের চমৎকার সরকার রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে আমি ইতিমধ্যে লক্ষ্য করেছি, তারা অত্যন্ত দায়িত্ববান এবং সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।’
তাহসিফকে পুলিশের ধাওয়া দেওয়ার বিষয়ে প্রকাশিত বক্তব্যকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেন তার বাবা। তিনি বলেন, ‘কে চায় এই ঝামেলার মধ্যে পড়তে? ওই অঞ্চলে সে কখনোই গিয়েছে বলে আমি মনে করি না। একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ধাওয়ায় দৌড় দেবে—এটা হাস্যকর বক্তব্য না? এটা তো প্রশ্নই আসে না।’
তাহসিফের ছোট্ট ব্যবসাটি দীপ দেখাশোনা করতেন বলে জানান কে এম এনায়েতুল করিম। তিনি বলেন, অন্য চাকরি করায় ছেলের ব্যবসার দেখাশোনার দায়িত্ব পড়েছিল দীপের ওপর। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন কোম্পানিতে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের কাজটি দেখতেন। এ কারণে দীপের সঙ্গে তাহসিফের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল।
তাহসিফের বাবার ভাষ্য, দীপ মাঝেমধ্যে তাদের বাসায় আসতেন এবং খাওয়া-দাওয়া করতেন। একবার দীপের বাবা-মা ও ছোট ভাইও তাদের বাসায় এসেছিলেন। তারা বেড়িয়ে গেছেন এবং দুপুরের খাবার খেয়েছেন।
ছেলের নিখোঁজ হওয়ার রাতের ঘটনা তুলে ধরে কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, তাহসিফ তার মাকে শেষবারের মতো একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠিয়েছিলেন। তাতে জানিয়েছিলেন, তিনি ফিরছেন বা রওনা হয়েছেন। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোনে আর যোগাযোগ করা যায়নি। তাহসিফের মা সারা রাত অপেক্ষা করেছেন। কিছুক্ষণ পরপর ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ছেলের সাড়া পাননি।
তিনি বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে ছেলেকে বাসায় না পেয়ে তিনিও ফোন করেন। ফোন বন্ধ পান। পরে দুপুরে তুরাগ থানায় গিয়ে ছেলের বিষয়ে খোঁজ নেন। সন্ধ্যার একটু আগে উত্তরখান থানা থেকে ফোন করে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর জানানো হয়, রাজাবাড়ী ঘাটে ছেলের মরদেহ পাওয়া গেছে।
তাহসিফের বাবা বলেন, ‘সে তো একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ। এজন্য অন্য কোনো ধারণার প্রশ্নই আসে না। ওই অঞ্চলে সে কখনোই গিয়েছে বলে আমি মনে করি না। সাধারণত সে বের হলে তার বন্ধুদের সঙ্গে গুলশান-বনানী এলাকায় যেত বলে আমি জানি।’
ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এবং ঘটনার তথ্য উদ্ঘাটনে সরকারের আন্তরিকতা প্রত্যাশা করেন তিনি। কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, ‘আমরা চাই, একজন সুনাগরিক হিসেবে সে দেশের জন্য একটা অ্যাসেট, কারণ সে একজন পাইলট। সরকার নিশ্চয়ই এ বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক ও দায়িত্ববান হবে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে, তথ্য উদ্ঘাটন করবে এবং এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
এদিকে তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার বিষয়ে অপেক্ষা করছে পুলিশ। তবে পরিবার মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নৌপুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকালে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করে কি না, তার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। পরিবার মামলা না করলে আইনানুগ ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।
তিনি আরও বলেন, ‘নৌ পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই ঘটনার তদন্ত করছে। তারা একজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই বাছাই করা হচ্ছে।’
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন তাহসিফ। পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় নৌ পুলিশ। ওইদিন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে উত্তরখান এলাকায় তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারের সময় তাহসিফের পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। তার হাতে একটি ঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। ওই ফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।