কক্সবাজারের উখিয়ায় মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন এলাকায় গভীর নলকূপ খননের সময় মাটি থেকে প্রবল বেগে বেরিয়ে আসা গ্যাসের আগুন ১৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে বিকেল ৫টার পর আগুনের লেলিহান শিখা ও তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায়। রাতের আঁধারে মাটির নিচে জ্বলতে থাকা এই আগুন দেখতে উৎসুক জনতা ইনানীর মেরিন ড্রাইভ ও ছোট ব্রিজ এলাকায় ভিড় জমায়।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ইনানী মেরিন ড্রাইভের ছোট ব্রিজ সংলগ্ন মোস্তফা সিকদারের বাড়ির উঠানে আকস্মিক আগুনের সূত্রপাত হয়।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সকাল থেকে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। আগুনের তাপ ও তীব্রতা আশংকাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় রাত তিনটার দিকে আশপাশের এলাকা থেকে লোকজনকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়। বড় ধরনের বিপর্যয় বা বিস্ফোরণের ঝুঁকি এড়াতে পুরো এলাকা ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া মাটি থেকে উঠে আগুনের লেলিহান শিখা আশপাশের বিদ্যুতের খুঁটি ও প্রধান সরবরাহ লাইনে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের মানখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য্য জানান, ফায়ার সার্ভিসের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় নিরাপত্তার স্বার্থে আশপাশের বাসিন্দাদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। দুর্ঘটনাস্থলে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখতে ফায়ার সার্ভিসের একটি বিশেষ দল মোতায়েন রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) জরুরী ভিত্তিতে ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রকৃতি ও পরিমাণ নিশ্চিত করার জন্য জানানো হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. ক. মান্নান বলেন, ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক গ্যাসের স্তর খুঁজে পেতে একটি সাধারণ নলকূপ ড্রিল করা হয়। সার্বিক জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে সরকারের বিশেষজ্ঞ সংস্থা বাপেক্সকে জানানোর পর ঢাকা থেকে দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সন্ধ্যার ফ্লাইটে কক্সবাজার পৌঁছে। রাতে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে গ্যাস ও আগুনের গতিবিধি পরীক্ষা করে পরবর্তী প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নেবেন।
উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এক কর্মকর্তা জানান, আগুনের ঠিক পাশেই রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রধান বিদ্যুতের খুঁটি। তারে আগুন লাগলে পুরো গ্রিডে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা ছিল। ফলে জননিরাপত্তার স্বার্থে পাটুয়ারটেক থেকে মানখালী পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইনটি সাময়িকভাবে বিদ্যুৎবিহীন রাখা হয়েছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম জানান, কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই এলাকায় কোনো সরকারি গ্যাস পাইপলাইন বা সরবরাহ লাইন নেই। তাই এটা নিশ্চিত যে, ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক স্তরে গ্যাসের উপস্থিতির কারণে এই তীব্র দাবানল হয়।
স্থানীয় জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের ৬নং ওয়ার্ডের সদস্য শামছুল আলম ঘটনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ঢাকার এক ব্যক্তি স্থানীয় মোস্তফা সিকদারের কাছ থেকে কিছু জমি কিনেছেন। প্রায় ১০-১৫ দিন আগে ওই জমিতে গভীর নলকূপ বসানোর কাজ শুরু হয়। প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ ফুট গভীরে যাওয়ার পরও কোনো পানি না পেয়ে সোমবার শ্রমিকরা পাশের অন্য জায়গায় আবার পাইপ বসানোর কাজ শুরু করে। এরপর মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বিকট শব্দে নলকূপের পাইপ দিয়ে মাটি থেকে গ্যাস বের হলে সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়।
শামছুল আলম আরো জানান, প্রথমে স্থানীয় বাসিন্দারা বালু ও পানি ছুড়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে সকাল সাড়ে ৮টায় উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট এবং পরে কক্সবাজার শহর থেকে আরেকটি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়। তবে গভীর রাত পর্যন্ত আগুন নেভানো সম্ভব না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। তবে এটা স্বস্তির বিষয় যে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি কোনো বসতবাড়ি বা আবাসিক হোটেল-রিসোর্ট না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা এড়ানো গেছে।