প্রতিকার চাইতে গিয়ে উল্টো বিপাকে: মূল ঘটনাই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে না তো?

3e5c6adbd31a83b9005a0a4842e6c96e 6adccf93098dc 3e5c6adbd31a83b9005a0a4842e6c96e 6adccf93098dc
3e5c6adbd31a83b9005a0a4842e6c96e 6adccf93098dc

সন্তানের ওপর যৌন নিপীড়নের বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো হামলা, ভাঙচুর ও অর্থ লুটের অভিযোগের মুখে এক বাবা। অন্যদিকে, নিরাপত্তা ও পুলিশের অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে থানায় গিয়ে ওসির সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়েছেন একজন সংসদ সদস্য। পরে সেই ঘটনাও সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। একটি ঘটনা গাজীপুরের টঙ্গীতে, অন্যটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে। প্রশ্ন উঠেছে, অন্যায়ের প্রতিকার চাইতে গিয়ে অভিযোগকারীই যদি পাল্টা অভিযোগ, আইনি জটিলতা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মুখে পড়েন; তাহলে সাধারণ মানুষের বিচার চাওয়ার পথ কতটা নিরাপদ?

সাম্প্রতিক ঘটনা দুটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে মূল অভিযোগের পরিবর্তে অভিযোগকারীর আচরণ ও পাল্টা অভিযোগ সামনে আসায় বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অভিযোগকারী কিংবা অভিযুক্ত, কাউকেই আগাম দোষী বা নির্দোষ বিবেচনা করা যায় না। তবে পাল্টা অভিযোগের আড়ালে মূল অপরাধের তদন্ত যাতে চাপা না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।

সন্তানের জন্য বিচার চাইতে গিয়ে বাবাই অভিযুক্ত

গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়ায় একটি আবাসিক মাদ্রাসায় ছয় থেকে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। শিশুটির বাবার করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) মাদ্রাসার নিচতলার সিঁড়িতে শিশুটিকে নিপীড়ন করা হয়। বিষয়টি জানার পর বুধবার (২১ অক্টোবর) স্বজনেরা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন জড়ো হলে শিক্ষককে মারধরের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। বৃহস্পতিবার শিশুটির বাবার মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে আদালতে পাঠানো হয়। 

তবে ঘটনার এখানেই শেষ নয়। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ শিশুটির বাবা ও অন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মারধর এবং ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ তুলেছে। থানায় পৃথক অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে শিশুটির বাবা শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দিবাগত রাতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার সন্তানের জন্য বিচার চাইতে মাদ্রাসায় গিয়েছিলাম, মব সৃষ্টি করতে নয়। তার দাবি, নির্যাতনের বিষয়টি আগে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো এখন তাকে হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি পরিবারের নিরাপত্তাও চেয়েছেন তিনি।

টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি আরিফুর রহমান জানিয়েছেন, উভয় পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ করেছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের কাছে প্রতিকার চাইতে গিয়ে ‘হয়রানির মুখে’ সংসদ সদস্য

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার সঙ্গে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়ার বাগবিতণ্ডাও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাতে রুমিন ফারহানা থানায় গিয়ে দুর্গাপূজার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না পাওয়া এবং পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। ওসির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগও করেন তিনি। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া।

রুমিন ফারহানার দাবি, স্থানীয় অপরাধ ও অনিয়মের তথ্যসংবলিত দুই পৃষ্ঠার তালিকা নিয়ে থানায় গেলেও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাননি। অন্যদিকে ওসির অভিযোগ, সংসদ সদস্য বিপুলসংখ্যক অনুসারী নিয়ে থানায় এসে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছেন।

ঘটনার পর থানায় জিডি করে পুলিশ। সংসদ সদস্যের সঙ্গে যাওয়া ব্যক্তিদের তালিকাও প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আরাফাতুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জিডিটি কোনও অভিযোগ নয়। উল্লেখযোগ্য ঘটনা নথিভুক্ত করতেই এটি করা হয়েছে।

মূল অভিযোগ আড়ালে পড়ছে না তো?

টঙ্গী ও সরাইলের ঘটনায় লক্ষণীয় বিষয় হলো, মূল অভিযোগের পাশাপাশি অভিযোগকারীর আচরণই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে। টঙ্গীতে শিশুনিপীড়নের অভিযোগের সঙ্গে সামনে এসেছে বাবার বিরুদ্ধে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ। আর সরাইলে পুলিশের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ছাপিয়ে আলোচনায় এসেছে সংসদ সদস্যের থানায় যাওয়ার ধরন ও সেখানে সৃষ্ট উত্তেজনা। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের এই পরিস্থিতিতে মূল ঘটনার তদন্ত কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের সমাজে উদ্বেগজনক একটি প্রবণতা হচ্ছে, অন্যায়ের প্রতিকার চাইতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে মূল অপরাধের চেয়ে অভিযোগকারীর আচরণ, অবস্থান কিংবা পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে প্রকৃত ঘটনার তদন্ত আড়ালে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।’

তিনি বলেন, ‘সন্তানের ওপর নিপীড়নের অভিযোগের পাশাপাশি বাবার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও তদন্ত করতে হবে। কিন্তু পাল্টা অভিযোগ যেন মূল অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়াকে দুর্বল করার হাতিয়ার না হয়। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও সামাজিক প্রভাবের কারণে অনেক মানুষ অভিযোগ করতেই ভয় পান। কারণ বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো মামলা, হুমকি কিংবা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

এই অপরাধ বিশ্লেষকের মতে, অভিযোগকারীকে প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। অন্যথায় বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ন্যায়বিচার চাওয়া কোনও অনুগ্রহ নয়, এটি প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। একজন মানুষ প্রতিকার চাইতে গিয়ে যদি নতুন করে ভয়ভীতি, পাল্টা অভিযোগ কিংবা হয়রানির আশঙ্কায় পড়েন, তাহলে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় এমন পরিস্থিতি অন্য ভুক্তভোগীদেরও অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘টঙ্গীর ঘটনায় শিশুনিপীড়নের অভিযোগ এবং বাবার বিরুদ্ধে ওঠা পাল্টা অভিযোগ, দুটিই নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। একইভাবে সংসদ সদস্যের তোলা পুলিশের অনিয়মের অভিযোগও যাচাই করা প্রয়োজন। জিডি আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটি যেন কারও ওপর অযৌক্তিক চাপ তৈরির কারণ না হয়।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিকার চাইতে গিয়ে পাল্টা অভিযোগের মুখে পড়লেই সেটিকে হয়রানি বলা যায় না। আবার পাল্টা অভিযোগকে ব্যবহার করে কাউকে চাপে রাখার সুযোগও নেই। উভয় ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Keep Up to Date with the Most Important News

By pressing the Subscribe button, you confirm that you have read and are agreeing to our Privacy Policy and Terms of Use
Press Nation Bangladesh