ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের রুল

1792063563220894 1792063563220894
1792063563220894

ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে নামে-বেনামে নির্ধারিত সীমার বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) সাবেক চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিচারপতি শওকত আলী চৌধুরী ও বিচারপতি আব্দুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। পাশাপাশি শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান ও অ্যাডভোকেট বিপ্লব কুমার দাশ।

ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারের রিট

এর আগে ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও ইস্টার্ন ব্যাংকের ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডার অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন। ব্যাংকিং খাতের আমানতকারী ও শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।

রিটে অভিযোগ করা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১৪ক(১) ধারা অনুযায়ী কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠান একটি ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারে না। কিন্তু শওকত আলী চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা সরাসরি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্ধারিত সীমার বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করছেন।

রিটের তথ্য অনুযায়ী, শওকত আলী চৌধুরী ও তাঁর পরিবার সরাসরি ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও ১১ দশমিক ১২ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করছেন। সব মিলিয়ে এ পরিমাণ ২১ দশমিক ১১ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ৩৩ কোটি ৬৭ লাখ শেয়ার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে রিটে দাবি করা হয়।

বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তের বরাত দিয়ে রিটে বলা হয়, শওকত আলী চৌধুরী তাঁর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান এসএন করপোরেশনের কর্মচারী নইমুল হক, তাঁর স্ত্রী সালমা শিরীন এবং নিজের শ্যালিকা অনিকা তাহজীবকে প্রক্সি বা নামমাত্র শেয়ারহোল্ডার হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ‘মেসার্স আরুশা অ্যান্ড কোং’ এবং ‘আনিকা শেয়ার্স অ্যান্ড সিকিউরিটিজ’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আরুশা অ্যান্ড কোংয়ের নামে ইবিএলের ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং আনিকা শেয়ার্স অ্যান্ড সিকিউরিটিজের নামে ১ দশমিক ১৪ শতাংশ শেয়ার ছিল।

রিটে আরও বলা হয়, আরুশা অ্যান্ড কোংয়ের সাবেক শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে শওকত আলী চৌধুরীর শ্যালিকা ও মেয়ের সম্পৃক্ততা ছিল। নথিপত্রে তাঁদের ঠিকানার সঙ্গে শওকত আলী চৌধুরীর ঠিকানার মিল পাওয়ার বিষয়টিও অভিযোগের পক্ষে তুলে ধরা হয়েছে।

শতকোটি টাকার শেয়ার ও লভ্যাংশের তথ্য

রিটের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের প্রতিষ্ঠান আরুশা অ্যান্ড কোং ২০০৯ সালের পর নতুন করে শেয়ার না কিনলেও বোনাস শেয়ারের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক শেয়ারের মালিক হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির হাতে ১৩ কোটি ৫৪ লাখের বেশি শেয়ার রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৩৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ২৪৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা নগদ লভ্যাংশ পেয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

রিটে দাবি করা হয়, শওকত আলী চৌধুরী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালক পদে থাকার সময় এসব লভ্যাংশ অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি জমি কেনার অগ্রিম বায়নার কথা উল্লেখ করে লভ্যাংশের অর্থ তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান এসএন করপোরেশনে ২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা স্থানান্তরের অভিযোগও আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি।

শেয়ার বিক্রির চেষ্টা নিয়েও অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও শেয়ার বাজেয়াপ্তির সম্ভাবনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট শেয়ার দ্রুত বিক্রির চেষ্টা চলছে বলেও রিটে অভিযোগ করা হয়েছে। রিটকারীর দাবি, এ ধরনের লেনদেনের মাধ্যমে শেয়ার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা হতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুশাসনসংক্রান্ত নীতিমালার আওতায় আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পরিচালক এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জবাব চেয়েছেন আদালত

হাইকোর্টের রুলে শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনবহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে জমা দিতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া রিটকারীর আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালতের এই আদেশের ফলে ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ার মালিকানা, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুসরণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বিষয়টি নতুন করে বিচারিক পর্যালোচনায় এসেছে। তবে রুল জারির অর্থ অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত রায় নয়; সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনার পর আদালত পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবেন।

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Keep Up to Date with the Most Important News

By pressing the Subscribe button, you confirm that you have read and are agreeing to our Privacy Policy and Terms of Use
Press Nation Bangladesh