২৩ মামলার আসামি ‘কিশোর গ্যাং নেতা’ ওয়াকিলের আত্মসমর্পণ

Whatsapp Image 2026 10 18 At 2.21.35 Pm Whatsapp Image 2026 10 18 At 2.21.35 Pm
Whatsapp Image 2026 10 18 At 2.21.35 Pm

চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, হত্যা, অস্ত্র ও দখলের অভিযোগে আলোচিত ওয়াকিল হোসেনের জামিন নামঞ্জুর

চট্টগ্রাম নগরে অপরাধজগতের আলোচিত নাম ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা। হত্যা, অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি ও দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে ২৩টি মামলা। একাধিক কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এত দিন পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে তাঁকে। জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।

রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মহিদুল ইসলামের আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চান ওয়াকিল। তবে আদালত তাঁর আবেদন গ্রহণ করেননি। চাঁদাবাজির একটি মামলায় আত্মসমর্পণের পর তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল চৌধুরী।

পুলিশের অভিযান, নগর ভবন ঘিরে বিতর্ক

ওয়াকিলকে গ্রেপ্তারে পুলিশের তৎপরতা নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে চট্টগ্রামে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। গত ৬ অক্টোবর নগরের টাইগার পাস এলাকার নগর ভবনে ওয়াকিলের অবস্থানের খবর পেয়ে সেখানে যায় পুলিশ। তবে তাঁকে পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটি ঘিরে পরদিন বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। তাঁর দাবি, ওয়াকিল নগর ভবনে ছিলেন না; তাঁর দুই ভাই মেয়রের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। মেয়র আরও বলেন, ওয়াকিল অপরাধ করে থাকলে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে এবং তিনি কাউকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন না।

তবে ওয়াকিলকে ‘সন্ত্রাসী’ নয়, ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করে মেয়রের দেওয়া বক্তব্যও আলোচনার জন্ম দেয়। অন্যদিকে, পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াকিলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ খোঁজ করছিল।

শিক্ষককে মারধরের অভিযোগ, পুলিশের ওপর হামলা

গত ২৯ আগস্ট পাহাড়তলী কলেজের অস্থায়ী শিক্ষক মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগে খুলশী থানায় মামলা হয়। ওই মামলায় ওয়াকিলকে আসামি করা হয়।

মামলা নেওয়াকে কেন্দ্র করে খুলশী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিমকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। এ বিষয়ে ওসি সাধারণ ডায়েরি করেন।

এরপর ৪ সেপ্টেম্বর সকালে ওয়াকিলকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালাতে গেলে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ জানায়। এতে ওসি আবদুর রহিমসহ ছয় পুলিশ সদস্য আহত হন এবং পুলিশের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় ওয়াকিলকে প্রধান আসামি করে ১৪ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ।

তবে এ অভিযানের বিষয়ে পাল্টা অভিযোগও রয়েছে। ওয়াকিলের বাবা আদালতে করা মামলায় দাবি করেন, পুলিশ তাঁদের বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর, লুটপাট ও পরিবারের সদস্যদের মারধর করেছে। এতে প্রায় ১৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়। অভিযোগটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধে প্রাণহানি, মামলায় ওয়াকিলের নাম

গত ২৯ সেপ্টেম্বর নগরের ওয়্যারলেস কলোনিতে কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষ—সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টারের বিরোধে হৃদয় নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। ওই হত্যাকাণ্ডের মামলাতেও ওয়াকিলকে আসামি করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াকিলের গ্রুপ সেভেন স্টার এবং খুলশী থানা যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল হোসেনের গ্রুপ ফাইভ স্টারের বিরোধের জের ধরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। তবে এ ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হওয়ার বিষয়।

প্লট দখল, অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগেও মামলা

গত ৬ অক্টোবর প্লট দখল, চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগে খুলশী থানায় আরও একটি মামলা হয়। এতে ওয়াকিলসহ ৩৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকেও আসামি করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম খবরের সম্পাদক ও প্রকাশক শেখ মুহাম্মদ আরিফ মামলাটি করেন। এজাহারে পাঁচটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, ১১ ফেব্রুয়ারি ও ২৫ এপ্রিল তাঁকে অপহরণ করে ওয়াকিলের আস্তানায় নিয়ে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, ওয়াকিলের ভাই নগর ছাত্রদলের সদস্য রকি হোসেন দাবি করেছেন, রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে একটি পক্ষ তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

এখন প্রশ্ন—অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার কত দূর?

একাধিক মামলা, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ, পুলিশের অভিযানে সংঘর্ষ এবং নগর ভবন ঘিরে বিতর্ক—সব মিলিয়ে ওয়াকিলকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আদালতে আত্মসমর্পণের পর তাঁর কারাগারে যাওয়া মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

তবে শুধু গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অপরাধে যারই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে।

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Press Nation Bangladesh