ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নানের নিজের ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভগ্নিপতির স্ত্রী নতুন সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। গত শুক্রবার প্রকাশিত এই তালিকার ভিত্তিতে স্বজনপ্রীতি ও টাকার বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। দল ছেড়ে যাওয়া নেতা-কর্মীরা বাদ পড়ায় স্থানীয় বিএনপির একাংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও প্রকাশিত তালিকা সূত্রে জানা গেছে, নাসিরনগরের ১৩টি ইউনিয়নে মোট ১৩ জন করে নতুন সার ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে। গোকর্ণ ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া মোহাম্মদ আদনান সাদী সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে, গোয়ালনগরের নুরুন্নাহার আক্তার তার ভাগ্নে শরিফুল ইসলামের স্ত্রী এবং সদর ইউনিয়নের আরক মিয়া তার আপন শ্যালিকা বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা। আরো জানা যায়, আরক মিয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের উপজেলা কমিটির সাবেক সভাপতি আসাদ চৌধুরীর ভাই।
বিএনপি সূত্র আরো জানায়, এমপির শ্যালক শরিফুল ইসলাম আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গোয়ালনগর থেকে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা করছেন। সেই উদ্দেশ্যে স্ত্রী নুরুন্নাহারের নামে ডিলারশিপ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নুরুন্নাহারের শ্বশুর সাদেক মিয়া চাতলপাড় ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক (তৎপরতা নিষিদ্ধ)।

তালিকা প্রকাশের পর থেকেই ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় বইছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাজিদুর রহমান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সার ডিলারে আওয়ামী লীগ বন্ধু!!! যদি তাই হয়, আপনার আওয়াজ তুলুন, প্রয়োজনে অপরাধের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সহ লিখুন।’
গুনিয়াউক ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘নাসিরনগর উপজেলায় সার ডিলার ও চাল ডিলার পেতে বিএনপির কর্মীদের লাগে না। ঠিক জায়গায় তেল দিতে হবে। খাঁটি আওয়ামী লীগ হলেও সমস্যা নেই।

এমপি এম এ হান্নান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারের আইন-কানুন মোতাবেক আমার ছেলে, ভগ্নিপতি ও ভগ্নিপতির স্ত্রীকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর তাদের আসনে (তিনটি ইউনিয়নে) যোগ্যতা সম্পন্ন কেউ আবেদন করেননি। মানুষ কথা বলবে। এগুলো সত্য নয়।’
টাকার বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের বাংলাদেশের মানুষের সমস্যা। এটা সম্পূর্ণ গুজব। কোনটিই সত্য নয়।’
বাকি নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারদের মধ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুড়িশ্বরের জসিম মিয়া আগে নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এবং তিনি উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক ওরফে দানার মিয়ার ভগ্নিপতি। স্থানীয় যুবদলের সভাপতি আনু মিয়ার ভাই কুন্দর রেনু মিয়া; আনু মিয়ার আগের ডিলারশিপ বাতিল হওয়ার পর এবার তার ভাইকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফান্দাউকের শারমিন আক্তার ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ফয়েজ আনসারীর স্ত্রী, তবে স্বামী-স্ত্রী কেউই সার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নয়। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের পক্ষে কাজ করায় উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে চাতলপাড়ের শামীমা আক্তারের স্বামী আলমগীর হোসেনকে। হরিপুরের আরিফুল ইসলাম ঢাকায় ফার্নিচারের ব্যবসা করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিয়মানুযায়ী সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে আবেদনকারীকে কমপক্ষে ২৫ টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি গুদাম দেখাতে হবে যার দৈর্ঘ্য ২০ ফুট, প্রস্থ ১৫ ফুট ও উচ্চতা ১০ ফুট। তবে নাসিরনগরে নতুন নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের অনেকেই এই মানদণ্ড পূরণ করেন না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপজেলা ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির অন্তত ২০ নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ তালিকায় দলত্যাগী কেউ নেই। ছাত্রদলের দুই নেতা ও বিএনপির দুই নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টাকার বিনিময়ে ডিলারশিপ বরাদ্দের কথা শুনেছি।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, ‘যারা আবেদন করেছেন তাদের নাম যাচাই-বাছাই করে জেলায় পাঠানো হয়েছে। আমি জানি না ওখান থেকে এটা কিভাবে হলো।’ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোস্তফা এমরান বলেন, “আমি একজন সরকারি কর্মচারী। সংসদ সদস্যরা প্রতিটি কমিটির উপদেষ্টা। এর বাইরে আমার কিছু বলার নেই।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ১০১টি ইউনিয়ন ও ৫টি পৌরসভায় সারের ১০৬টি ডিলারশিপের বিপরীতে মোট ৮২৫ জন আবেদন করেন। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিনজন প্রার্থীর নাম সুপারিশ করে এবং সার ডিলারদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে পাঠায়। সেখান থেকে, 292টি অ্যাপ্লিকেশন অবশেষে সুপারিশ করা হয়েছিল।