রণক্ষেত্র ফ্রান্স: পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

ফ্রান্সজুড়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভে পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্র ও বলপ্রয়োগ নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্কুলে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষক সংকট নিরসন এবং জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নতির দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বেশ কয়েকজন কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে।

প্যারিসের উপকণ্ঠে ১৪ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী পুলিশের ছোড়া টিয়ার গ্যাস গ্রেনেডে গুরুতর আহত হয়েছে। এতে তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং বেশ কয়েকটি দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পর ওই গ্রেনেড ছোড়া পুলিশ কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়া হয় এবং গুরুতরভাবে আহত করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

অস্ত্রোপচারের পর ওই কিশোর কথা বলতে পারছে না এবং তার মা জানিয়েছেন, বর্তমানে সে শুধু স্ট্র দিয়ে খাবার খেতে পারছে।

এদিকে, ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের ব্যবহৃত অস্ত্রের কারণে আরও কয়েকজন কিশোরের জীবন বদলে দেওয়ার মতো আঘাতের ঘটনা ঘটেছে। সাবেক খনিশহর লঁসে ১৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী পুলিশের একটি স্টান গ্রেনেড-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় হাত হারিয়েছে। আর লোয়ার অঞ্চলের তুর শহরে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর পুলিশের দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি গুলির আঘাতে আংশিকভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে বলে প্রসিকিউটর জানিয়েছেন।

শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার এবং পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ নিয়েও সমালোচনা চলছে। সরকারবিরোধী সমালোচক ও মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, পুলিশের ব্যবহৃত বলপ্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠোর ছিল।

হাজারো তরুণকে গ্রেপ্তার

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে পুলিশ ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের বেশিরভাগই তরুণ। শুধু মঙ্গলবার দেশজুড়ে বিক্ষোভ চলাকালে ৪৮৮ জনকে আটক করা হয়।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্যারিস অঞ্চলের একটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শুরু হয়। পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

আইনজীবী ও ফরাসি পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা করা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, পুলিশের কঠোর অবস্থান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে রাষ্ট্র ও প্রজাতন্ত্রের প্রতি হতাশা তৈরি করতে পারে।

প্যারিসের আইনজীবী অ্যালেক্সিস বোদেলিন বলেন, তার হেফাজতে নেওয়া তরুণ মক্কেলরা পুলিশের ‘নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা’র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক তরুণকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আটকে রাখা হয়েছে। তাদের ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় বিভিন্ন ধরনের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

কিছু গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিত

ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের মধ্যে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বুধবার ঘোষণা করেন, লঁসে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর হাত হারানোর ঘটনায় যে ধরনের স্টান গ্রেনেড ব্যবহারের সন্দেহ রয়েছে, উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে সেটির ব্যবহার আর করা হবে না।

মন্ত্রী বলেন, ওই অস্ত্রের কারণেই শিক্ষার্থীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ‘জোরালো সম্ভাবনা’ রয়েছে এবং ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছে তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

তবে একই সঙ্গে তিনি পুলিশের অধিকাংশ পদক্ষেপকে ‘অনুপাতসম্মত’ বলে দাবি করেছেন। তার বক্তব্য, বিক্ষোভের কিছু অংশ দাঙ্গা, ভাঙচুর ও অন্যান্য সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রাপ্তবয়স্কদের আন্দোলনের মতো করে মোকাবিলা করা যায় না।

১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর চোয়াল ও দাঁত ভেঙে যাওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে ওই কিশোরের ধস্তাধস্তির সময় সহকর্মীকে রক্ষা করতে তিনি মুহূর্তের মধ্যে গ্রেনেড ছোড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তদন্তকারী প্রসিকিউটর কার্যালয় ওই কর্মকর্তার পদক্ষেপকে ‘অনুপাতহীন’ বলে উল্লেখ করেছে। তাকে দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

গ্রেপ্তারের পর আরও দৃঢ় শিক্ষার্থীরা

মঙ্গলবার প্যারিসে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন কিশোর জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে তাদের গ্রেপ্তার করে হাতকড়া পরানো, তল্লাশি এবং পুলিশ হেফাজতে রাখা হলেও পরে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়।

১৭ বছর বয়সী সামি ও ওয়ারকিয়া জানান, আরও এক বন্ধুর সঙ্গে তাদের আটক করা হয়েছিল। তাদের ধারণা, গায়ের রঙের কারণে পুলিশ তাদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল। ওয়ারকিয়া ও তার বন্ধু কৃষ্ণাঙ্গ এবং সামি নিজেকে আরব হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

তবে ফরাসি কর্মকর্তারা পুলিশের মধ্যে বর্ণবাদ থাকার অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছেন। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু সংসদে এসব অভিযোগকে ‘মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছেন।

সামি বলেন, পুলিশ তাদের থামিয়ে শুধু বলেছিল, ‘তুমি, তুমি এবং তুমি—আমাদের সঙ্গে চলো।’ তার ভাষ্য, তাদের বিরুদ্ধে আটক করার কোনো স্পষ্ট কারণ ছিল না।

তিনি বলেন, ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের কথা শোনার বদলে তাদের ওপর পুলিশ পাঠানো হচ্ছে।

ওয়ারকিয়া জানান, পুলিশ হেফাজতে থাকার প্রথম অভিজ্ঞতা তাকে বিক্ষোভ থেকে পিছিয়ে দেয়নি; বরং আন্দোলনে তার সংকল্প আরও দৃঢ় হয়েছে।

তবে একই সঙ্গে পুলিশের উপস্থিতি দেখলে পালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তিনি উপলব্ধি করেছেন।

তার ভাষায়, ‘পুলিশ আমাদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। আমাদের কিছুই করার নেই।’

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Press Nation Bangladesh