মুচি বা ফেরিওয়ালার ছদ্মবেশে অপরাধের খবর খুঁজছিলেন সাংবাদিক আলিফ, খুনের নেপথ্যে কী আছে?

420dc5c8eef3f063ecf846563af48270 6ad656a724681 420dc5c8eef3f063ecf846563af48270 6ad656a724681
420dc5c8eef3f063ecf846563af48270 6ad656a724681

কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ছদ্মবেশে সীমান্ত এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। উদ্দেশ্য ছিল মাদক ব্যবসা, চোরাচালান ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনসহ বিভিন্ন অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করা। অনুসন্ধানী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের এমন কর্মকাণ্ড তার সহকর্মী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অপরাধের তথ্য প্রকাশের ঘোষণার পর, তার গুলি করে মৃত্যুর তদন্তের ধরণ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।

খুনের আগের দিন আলিফ সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘গডফাদার অফ সেনসেশনাল ক্রাইম টুমরো……’ মুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে তাকে হত্যার পর সে কী অপরাধ প্রকাশ করতে যাচ্ছে এবং হত্যার সঙ্গে তার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সীমান্ত এলাকায় মাদক, চোরাচালান ও অপরাধ ছাড়াও কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসকে ঘিরে বাংলাদেশি পরিচয়ে রোহিঙ্গা নাগরিকদের ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে আলিফ হত্যার সরাসরি কোনো যোগসূত্র এখনো পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা এবং হত্যার সম্ভাব্য যোগসূত্র তদন্তের মাধ্যমেই পাওয়া যাবে।

এর আগেও আলিফের ওপর হামলা হয়েছিল
পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের মতে, অপরাধের তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির জন্য এর আগে আলিফের ওপর হামলা হয়েছিল। গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্গাপুর শহরের উকিলপাড়া এলাকায় এবং নভেম্বরে সোমেশ্বরী নদীর টেরিবাজার ঘাটে হামলার শিকার হন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

সহকর্মীরা জানায়, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত এলাকায় মাদক ব্যবসা, চোরাচালান ও অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর নিতেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তথ্য সংগ্রহের জন্য কখনও সে নিজেকে মুচি, কখনও ফেরিওয়ালা, এমনকি মানসিকভাবে অস্থির ব্যক্তির ছদ্মবেশ ধারণ করে। পূর্ববর্তী আক্রমণগুলি তার অনুসন্ধানী কাজের ঝুঁকি সম্পর্কে নতুন করে উদ্বেগ উত্থাপন করেছে।

আলিফের মৃত্যুর আগে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ শিরোনামে তার ফেসবুক পেজেও অপরাধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। সহকর্মীদের মতে, পোস্টের উপর ভিত্তি করে তার শেষ অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু সনাক্ত করা তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তার মোবাইল ফোন, কল লিস্ট, সোশ্যাল মিডিয়া মেসেজ, আর্কাইভড নথি এবং অপ্রকাশিত রিপোর্ট থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

রোহিঙ্গাদের এনআইডি করার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন
আলিফকে হত্যার আগে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ে পাঁচ রোহিঙ্গা নাগরিকের ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি তৈরির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগে বলা হয়, রংছটি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের নাম তাদের ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নথি যাচাইয়ের সময় কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।

এর আগে একই নির্বাচন অফিসে রোহিঙ্গা নাগরিকদের এনআইডি তৈরি করায় কয়েকজন শ্রমিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়। মৃত্যুর আগে আলিফের ফেসবুক পেজে রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও জন্ম নিবন্ধনে ভুয়া তথ্য ব্যবহারের তদন্তের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অবৈধ বালু ব্যবসা ও পাথর উত্তোলনের বিষয়েও পোস্ট দেন।

জাতীয় পরিচয়পত্রের অপব্যবহার শুধু ভোটার নিবন্ধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা, মোবাইল ফোন সিম নিবন্ধন, পাসপোর্ট তৈরি এবং বিভিন্ন নাগরিক পরিষেবার জন্যও ব্যবহৃত হয়। ফলে কোনো বিদেশি নাগরিক ভুয়া বাংলাদেশি পরিচয় দিয়ে এনআইডি পেলে তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। এ কারণে অভিযোগের তদন্তে আবেদনকারীদের পাশাপাশি নথি তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাদক মামলায় গ্রেফতারের পুরনো রেকর্ড
সীমান্ত অপরাধ ও রোহিঙ্গা পরিচয়ের অভিযোগে কয়েক বছর আগে একটি মাদক মামলাও আলোচনায় আসে। নেত্রকোনা সদরের কে-গাতি ইউনিয়নের চুয়ারকান্দা গ্রামের ইলিয়াস কাদের বাবুলের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে মাদক সংক্রান্ত মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে।

২০২২ সালের মে মাসে ময়মনসিংহে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে বাবুল, তার রোহিঙ্গা স্ত্রী রোজিনা বেগম এবং আরও সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে বাবুল মাদক ব্যবসার সুযোগ নিতে ওই নারীকে বিয়ে করেছিলেন। টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে স্ত্রী ও আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে ময়মনসিংহে সরবরাহ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বাবুলকে ঘিরে থাকা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে তার রোহিঙ্গা স্ত্রী ও তার আত্মীয়দের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা এবং স্থানীয় পরিচয় ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশি পরিচয়পত্র তৈরির চেষ্টা। তবে এসব অভিযোগ আলিফ হত্যার সঙ্গে জড়িত কি না, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি।

কারা এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করছে, সেটাই প্রশ্ন উঠেছে তদন্তে
আলিফ হত্যায় সন্দেহভাজন মাঠ হামলাকারীকে গ্রেপ্তারের পর নতুন করে তদন্তের পরিধি তৈরি হচ্ছে। সহকর্মীদের মতে, আক্রমণকারীকে সরাসরি শনাক্ত করা যথেষ্ট নয়; হত্যার পরিকল্পনা, মূল হোতা, অর্থ সরবরাহ এবং ঘটনার আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা দরকার।

পুলিশ ঘটনাটিকে পরিকল্পিত টার্গেট কিলিং হিসেবে বিবেচনা করছে, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আলিফের সহকর্মীরা বলছেন, হত্যার আগে তার শেষ অনুসন্ধান, আগের হামলা এবং সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা দরকার।

তাদের মতে, আলিফ কী তথ্য প্রকাশ করতে যাচ্ছেন, তার তদন্তে কারা জড়িত ছিল, আগের হামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না এবং রোহিঙ্গাদের কথিত এনআইডি তৈরি, মাদক সরবরাহ ও সীমান্ত অপরাধের মধ্যে কোনো যোগসূত্র ছিল কি না- এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। এ জন্য সহকর্মীরা তার ডিজিটাল ডিভাইস, ব্যক্তিগত নোট, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রতিবেদন এবং মৃত্যুর আগের দিনগুলোর যোগাযোগের তথ্য পরীক্ষা করার দাবি জানান।

গ্রেফতারকৃত আসামিদের এক দিনের রিমান্ড
এদিকে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যা মামলায় গ্রেফতার সজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বকে এক দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়া এ আদেশ দেন। এর আগে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুর্গাপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আসাদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলুঞ্জিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির পাশের একটি দোকানের সামনে গুলিবিদ্ধ হন আলিফ। পরে তিনি মারা যান। করোনার মতে, তার শরীরে ছয়টি গুলির চিহ্ন রয়েছে।

ঘটনার পর শনিবার বেলা ১টার দিকে দুর্গাপুর শহরের মধ্যবাজার এলাকার পুরাতন সিনেমা হলের পাশ থেকে সজিবুল ইসলামকে আটক করে পুলিশ। সে পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকার শমসের আলীর ছেলে। ২০২৫ সালের জানুয়ারী দুর্গাপুরের উপ-পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলায়ও তাকে গ্রেফতার করা হয়।

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহম্মদ জানান, সাংবাদিক আলিফ হত্যার কারণ খুঁজে বের করতে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে তদন্ত চলছে।

আলিফের মৃত্যুর পর দুই ছোট বাচ্চা নিয়ে তার পরিবার অস্থির হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, সহকর্মীরা তার শেষ অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু এবং তদন্তে হত্যার পেছনের উদ্দেশ্য প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাদের আশা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা এবং এর পেছনে কোনো অপরাধী চক্র বা পরিকল্পনা ছিল কিনা তা উদঘাটন করা।

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Press Nation Bangladesh