আইজিপি রাজধানীর চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বলেছেন, “কোনো কিছু ঘটলে, যেমন মাদক, সমাজে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চললেও আপনারা অনেকে (সাংবাদিকরা) কোনো কিছু মনে করতেছেন না। সেখান থেকে গোপনে টাকা নিতেছেন। সাংবাদিক সাহেবেরা যখন ওখান থেকে পয়সা না পাইতেছেন তখন লিখতেছেন ‘বাংলাদেশে পুলিশ অকার্যকর হয়ে গেছে’। কেন? আমরা বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা, কোন মানবাধিকার লঙ্ঘন করি নাই। আমরা কোন আনওয়ান্টেড ফোর্স এপ্লাই করি নাই।”
মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের ভেতরেও শুদ্ধি অভিযান
এদিকে মাদকে জড়িত দুই মাসে ২৭ পুলিশ সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের কাছে মাদকাসক্তদের নেই কোন পরিসংখ্যান।
দেশজুড়ে মাদকে সয়লাব। এটি এখন সামাজিক সংকটগুলোর মধ্যে বড় একটি সমস্যা। মাদকবিরোধী অভিযানের মধ্যে বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও খোদ পুলিশেরই কিছু সদস্য মাদক সেবন ও কারবারে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ দীর্ঘ সময়ের। বাস্তবে বাংলাদেশ পুলিশের কত শতাংশ সদস্য মাদক অপরাধে জড়িত,এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো নির্দিষ্ট হিসেব নেই বা থাকার কথা নয়।
পুলিশের কত সদস্য মাদকাসক্ত, নেই নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান
বিভিন্ন ঘটনার তথ্য থেকে জানা গেছে,পুরো বাহিনীর নয়, সীমিত সংখ্যক সদস্যের সমস্যা।
বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত দুই মাসে পুলিশের ২৭ কর্মকর্তা ও সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেছেন, পুলিশ বাহিনীর ভেতর থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করা হয়েছে। অপরাধে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। গত দুই মাসে আমি ২৭ জন পুলিশ অফিসার, পুলিশ সদস্যকে জেলে পাঠিয়েছি এই মাদকের কারণে। আপনারা আর কী চান? আগে ঘর পরিষ্কার হোক, তারপরে আপনারা পরিষ্কার হবেন। পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও মাদক নির্মূলে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে আইজিপি বলেন, পুলিশ বাহিনীকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল। যারা বাহিনীকে দুর্বল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাদকবিরোধী অভিযানের দায়িত্ব নিয়ে কোনো পুলিশ সদস্য নিজেই মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়তে পারেন না।
রোববার বাগেরহাট জেলা পুলিশ লাইন্স মিলনায়তনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন তিনি।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে বারবার বলে আসছেন, বাহিনীর ভেতরে মাদক বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।পুলিশের মধ্যে কত শতাংশ সদস্য মাদক সেবন বা কারবারে জড়িত এ বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তথ্য বলছে, এটি পুরো বাহিনীর নয় বরং সীমিত সংখ্যক সদস্যের সমস্যা।
ডিএমপির ডোপ টেস্টে শনাক্ত ১২৬ পুলিশ সদস্য
সূত্র জানায়, পুলিশ সদস্যদের মাদকমুক্ত করতে গত ২০২০ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) ডোপ টেস্ট বা মাদক পরীক্ষা শুরু করা হয়। তখন ডিএমপির কনস্টেবল থেকে উপপরিদর্শক (এসআই) পদমর্যাদার ১২৬ জন মাদকাসক্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে চাকরিচ্যুত হন ১১৬ জন। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই একজন মারা যান এবং আরেকজন অবসরে চলে যান। আর বাকি আটজনকে শাস্তি আওতায় আনা হয়। পুলিশকে মাদকমুক্ত ও সুশৃঙ্খল রাখতে-ই ডোট টেস্ট বা পরীক্ষা চালু রাখা জরুরি ছিল বলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাগণ জানিয়েছেন।
২০২০ সালে শুরু, পরে কমে যায় ডোপ টেস্ট
গত ২০২০ সালের ১০ মার্চ থেকে ডিএমপিতে ডোপ টেস্ট শুরু হয়ে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত জোরেশোরে চলে। এরপর ২২ সালের আগস্ট থেকে ডোপ টেস্টে শনাক্তের সংখ্যা কমে গেছে। তবে এরপর শুধুই সন্দেহভাজন পুলিশ সদস্যদের এই ডোপ টেস্ট করা হয়। অনেকের চাকরি চলে যাওয়ায় পুলিশে মাদকাসক্তের সংখ্যা কমে যায়।
সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ১০ মার্চ পুলিশকে মাদকমুক্ত করতে ডিএমপিতে ডোপ টেস্ট (মাদকাসক্ত চিহ্নিতের পরীক্ষা)শুরু হয়। তা ২০২২ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত ডোপ টেস্টে ১২০ জন পুলিশ সদস্যকে মাদকাসক্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ২০২১ সালের মার্চ থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত এই ১৬ মাসে মাত্র ২০ জন পুলিশ সদস্য শনাক্ত হন। ওই বছরের আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ডোপ টেস্টে কেউ মাদকাসক্ত হিসেবে শনাক্ত হননি। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ছয়জন পুলিশ সদস্য মাদকাসক্ত হিসেবে শনাক্ত হন।
মাদকের খরচ মেটাতে কারবারে জড়ানোর অভিযোগ
ডিএমপির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডোপ টেস্টে বেশি পজিটিভ হয়েছেন পুলিশ কনস্টেবলরা। ডোপ টেস্টে মাদকাসক্ত হিসেবে শনাক্ত হওয়া ১২৬ পুলিশ সদস্যের মধ্যে ৯৮ জনই কনস্টেবল। বাকিদের মধ্যে একজন পুলিশ পরিদর্শক, ১১ জন উপপরিদর্শক (এসআই), একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট, সাতজন সহকারী উপরিদর্শক (এএসআই) এবং আটজন নায়েক।
ডিএমপি সূত্রমতে, গত ২০২০ সালের শুরুতে ডিএমপিতে সাতজনের ডোপ টেস্ট করলে বেশির ভাগের ফল পজিটিভ আসে। পরে বিভিন্ন ইউনিটের আরও ১৮ জনের পরীক্ষা করলে একজনের পজিটিভ আসে। এতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সতর্ক হন। মাদকবিরোধী শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর বিভিন্ন সূত্র থেকেও মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের ব্যাপারে তথ্য পান সংশ্লিষ্টরা। এরপর রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড ও রেললাইন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে মাদক চক্রের ২১ কারবারিকে গ্রেফতার করে সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশ। পরে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে সংশ্লিষ্ট থানার কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক কারবারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। কারবারিদের সহযোগিতাকারী হিসেবে প্রথমে শিল্পাঞ্চল থানার এক সহকারী উপপরিদর্শকের (এএসআই) নাম আসে। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাসিক অপরাধ সভায় উপস্থিত ডিএমপির ৫০ থানার ওসিদের এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়।
মাদকবাজার ও দুর্নীতির ঝুঁকি
জানা গেছে, পুলিশ বাহিনীর ডোপ টেস্ট তোরজোড়ভাবে শুরু হলে, শোরগোল শুরু হয় বাহিনীর মধ্যে। একপর্যায়ে দাবি উঠে শুধু কনস্টেবল, এএসআই, এসআই আর ইন্সপেক্টরগণ ডোপ টেস্ট করাবে। ডোপ টেস্ট করানো হলো, আইজি পর্যন্ত করতে হবে। এরপরই উর্ধ্বতন পুলিশ অফিসাদের মধ্যে এই ডোপ টেস্টের বিষয়ে অনীহার সৃস্টি হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পুলিশ সদস্য জানান, বন্ধুর পাল্লায় পড়ে কৌতূহলী হয়ে প্রথমে মাদক গ্রহণ করেন। এরপর সেই বন্ধুর চাপাচাপিতে পুনরায় মাদক গ্রহণ করেন। এভাবে আস্তে আস্তে তিনি মাদকসেবী হয়ে পড়েন। শুধু তাই নয়, তার সান্নিধ্যে পড়ে তার ব্যাচমেট ছাড়াও ব্যারাকের রুমমেটরা মাদকাসক্ত হন। প্রতিদিন তাদের তিন থেকে চারটি ইয়াবা সেবন করতে হতো। আর প্রতিদিন তিনটি ইয়াবার জন্য ১ হাজার টাকা হিসাবে মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকার বেশী খরচ হয়। অথচ একজন পুলিশ কনস্টেবল বেতন পান ১৭ হাজার টাকা। মাদকের খরচ চালাতে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে যান তারা। এভাবে পুলিশ লাইনের অনেক সদস্য মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন।
দেশে মাদকাসক্তির ব্যাপ্তি নিয়ে উদ্বেগ
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের মাদকবাজার বিশাল হওয়ায় বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্যের তুলনায় মাদক মামলায় অভিযুক্ত সদস্যের সংখ্যা খুবই নগণ্য। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তা প্রকাশ্যে আসে না। ফলে সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। তাঁরা আরও বলছেন, এত বড় বাজারের কারণে অপরাধচক্র মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমীক্ষা অনুযায়ী, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ৭৭ লাখ ৬০ হাজার এবং নারী ২ লাখ ৮৫ হাজার। এর বাইরে ২ লাখ ৫৫ হাজার শিশু-কিশোর মাদকে আসক্ত রয়েছে। এসব মাদকাসক্ত ব্যক্তির মধ্যে প্রায় ৬১ লাখ গাঁজায় (প্রায় ৫২ শতাংশ), ২৩ লাখ ইয়াবায় (প্রায় ২০ শতাংশ) এবং ২০ লাখ ২৪ হাজার মদ্যপানে (১৭ শতাংশ) আসক্ত। এ ছাড়া ৩ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ ফেনসিডিল ও সমজাতীয় মাদকে এবং ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ হেরোইনে আসক্ত।
বেকারত্ব কমানো ও সামাজিক সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব
পুলিশ প্রধান বলেছেন, সকলের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন দরকার। আমাদের বেকারত্ব আছে, প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ লাখ শিক্ষিত বেকার, বেকারের সংখ্যার সাথে যোগ হচ্ছে। তাদেরকে পুনর্বাসন করার জন্য মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের “জিরো টলারেন্স”। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে আমরা বাল্যবিবাহ, কিশোর গ্যাং, মাদক, দুর্নীতি, জীবনের মান উন্নয়নসহ পনেরোটি সমস্যা সামনে এসেছে। এগুলো সমাধানের জন্য পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।