মঙ্গলবার রাতে দিল্লিতে নাটকীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়, যখন পুলিশ বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও অন্যান্য সাংসদদের একটি বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধনের জেরে ভারতের শীর্ষ নির্বাচন কর্মকর্তার পদত্যাগের দাবিতে তাঁরা বিক্ষোভ করছিলেন।
পুলিশ কর্তৃক গান্ধীকে জোর করে বাসে তোলা এবং বাসের জানালা দিয়ে বের হতে বাধা দেওয়ার ভিডিও পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়।
এই বিক্ষোভ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিরোধী দলের বিরোধে নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
বিরোধী দলগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভারতের শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা দেওয়ার জন্য ভোটার তালিকা সংশোধনের অভিযোগ করেছে। বিজেপি এবং কমিশন উভয়ই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের দিকে মিছিল করার সময় বাধা পাওয়ার পর গান্ধী, তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদরা এবং অন্যান্য সাংসদরা নিকটবর্তী একটি ভবনে সারাদিন ধরে প্রতিবাদে বসেছিলেন।
কমিশন জানিয়েছে যে তারা বিরোধী দলের সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছুক, কিন্তু সংসদে তাদের প্রস্তাবিত ২৪০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের বৈঠকের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, দলের একজন প্রতিনিধিকে সাক্ষাতের জন্য অনুরোধ করতে হবে এবং সভাগুলো কমিশনেই অনুষ্ঠিত হয়।
“আমরা সবাই বিরোধী দলের সাংসদ… এবং আমরা শুধু তাদের সাথে কথা বলতে চাই,” তিনি সাংবাদিকদের বলেন। “আমি জানি না নির্বাচন কমিশন কেন আমাদের সাথে কথা বলতে চায় না।”
সংবাদ সংস্থা এএনআই পুলিশের এক বিবৃতির বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, “আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং পরিস্থিতির অবনতি রোধ করতে” বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অনুমতি ছাড়া আকাশবাণী ভবনে প্রবেশের জন্য গান্ধী পরিবারের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে একটি অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে বলে পিটিআই সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে।

মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন সদর দপ্তরের চারপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল এবং পুলিশ সংসদ ও কমিশনের কার্যালয়ের মধ্যবর্তী রাস্তাগুলোতে ব্যারিকেড দিয়েছিল।
জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার পথে বিক্ষোভকারীদের চেয়ে পুলিশ কর্মকর্তার সংখ্যাই বেশি ছিল, যাদের কয়েকজনের হাতে লাঠি ও শরীরে ক্যামেরা ছিল।
বিকেলে কমিশনে পৌঁছানোর জন্য বিকল্প পথ ধরার চেষ্টা করা বেশ কয়েকজন সাংসদকে আটক করা হয়েছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা মনজিৎ শেওরান।
“তাদেরকে বাসে করে তুলে বিভিন্ন থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল,” তিনি বলেন।
গান্ধী ভাইবোনদেরও আটক করে একটি পুলিশ বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর তাঁরা পুনরায় পদযাত্রা শুরু করেন এবং নির্বাচন কমিশন সদর দপ্তরের কাছে আকাশবাণী ভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট পালন করেন।
কতজন সাংসদকে আটক করা হয়েছে তা পুলিশ জানায়নি। বিরোধী দল জানিয়েছে, বিভিন্ন দলের ২৩৭ জন সাংসদ এই মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন।
জেন জি সমর্থিত অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) মুম্বাই ও দিল্লিতে সিইসি-র পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ আয়োজন করার মাত্র চার দিন পরেই মঙ্গলবারের এই প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হলো। দলটি ওই বিক্ষোভগুলোকে একটি দেশব্যাপী আন্দোলনের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং আগামী ১০ অক্টোবর আরও এক দফা প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। এই প্রক্রিয়াটি দেশের অন্যান্য অংশে সম্প্রসারিত হওয়ার আগে ২০২৫ সালের জুন মাসে পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারে শুরু হয়েছিল।
কমিশন জানিয়েছে, এই সংশোধনের উদ্দেশ্য হলো ভোটার তালিকা থেকে নকল ও অযোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়া। দেশজুড়ে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে এ পর্যন্ত ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিরোধী দল ও কর্মীরা অভিযোগ করেছেন যে বহু যোগ্য ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনকে প্রক্রিয়াটি অনুচিতভাবে পরিচালনা করার জন্য অভিযুক্ত করেছেন।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয় যে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী ১০ মাসের মধ্যে অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে এমন সব সিদ্ধান্ত ও আদেশের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিলেন, যেগুলো তাদের মতে, তাদের অজান্তেই কমিশনের নামে জারি করা হয়েছিল। এরপরই কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গতি পায়।
প্রতিবেদন অনুসারে, ভোটার তালিকায় সংযোজন ও বিয়োজন, ভোটার ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার এবং নির্বাচনী তথ্যের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কিত আপত্তিগুলো ছিল।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও দুজন নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের কমিশন তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে, ভিন্নমত থাকা প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমেরই একটি অংশ এবং চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে।
তথাপি এই তথ্য প্রকাশের ফলে একটি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং বিরোধী নেতারা কুমারের পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো করেন।

কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খার্গে বলেছেন, তাঁদের তিনটি ‘অমীমাংসিত’ দাবি রয়েছে: কুমারের পদত্যাগ, এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল এবং কাগজের ব্যালটে ভোট দেওয়ার পদ্ধতিতে ফেরা।
নির্বাচন প্রধানকে উপহাস করে রাহুল গান্ধী টুইট করেছেন: ‘জ্ঞানেশ, কাজটা হয়ে গেছে, ভাই। এবার পদত্যাগ করার পালা।’
বিজেপি এই বিক্ষোভের নিন্দা করেছে।
বিজেপি সাংসদ সম্বিত পাত্র এগুলোকে ‘নৈরাজ্যের’ মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের একটি ‘পরিকল্পিত প্রচেষ্টা’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টার অভিযোগ করেছেন।
এই বিতর্ক ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্তও পৌঁছেছে, যা কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশন উভয়কেই একটি আবেদনের জবাব দিতে বলেছে। আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, কুমার অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের অনুমোদন ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।