তাহসিফ ও দীপের শেষ সাত ঘণ্টা: সিসিটিভির বাইরে কোথায় ছিলেন

8dbd930df1617209ca19483bf975608e 6ae6016fbe41f 8dbd930df1617209ca19483bf975608e 6ae6016fbe41f
8dbd930df1617209ca19483bf975608e 6ae6016fbe41f

রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে  পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে বেরিয়েছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি ও তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে তাদের উপস্থিতির তথ্য মিলেছে সিসিটিভি ফুটেজে। রাত ১১টা ৫১ মিনিটে সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও এসেছে সামনে। এরপর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ মাকে পাঠান একটি ভয়েস মেসেজ— ‘রওনা দিয়েছি, আসছি’। কিন্তু বাড়ি আর ফেরা হয়নি বিমানবাহিনীর ২৮ বছর বয়সী সাবেক এই কর্মকর্তার। তবে বাসায় ফিরেছেন দীপ। পরদিন বিকালে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় তার নিথর মরদেহ। মাঝখানের ৭ ঘণ্টা কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন তাহসিফ ও দীপ, কার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কেনইবা গভীর রাতে পৌঁছেছিলেন নদীর তীরের নির্জন এলাকায়, এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন এখন গোয়েন্দারা।

ঘটনার পর চার দিন পেরিয়ে গেলেও তাহসিফের মৃত্যু রহস্য জানা যায়নি। তবে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, তাহসিফ সাউরি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, প্রাথমিকভাবে তারা নিশ্চিত। এখন ময়না তদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে বাসার গ্যারেজ ও রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজ, অন্যদিকে বন্ধু দীপের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, মধ্যরাতের ভয়েস মেসেজ এবং নদীর কাছ থেকে মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনাগুলো মিলিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এর মধ্যে হত্যা মামলা হয়েছে, চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে দীপকে।

সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিট: বাসা থেকে শেষ যাত্রা

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসার নিচে আসেন দীপ। প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজের বর্ণনা অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে মোটরসাইকেল নিয়ে গ্যারেজে প্রবেশ করেন তিনি। কিছুক্ষণ পর তাহসিফ নিচে নেমে তার সঙ্গে হাত মেলান। দুজনের মধ্যে কথাবার্তা হয়। সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে তাদের পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।

স্বজনদের তাহসিফ জানিয়েছিলেন, দীপ এসেছেন, তার সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসবেন। কিন্তু ওই মুহূর্তে দুজনের প্রকৃত গন্তব্য কোথায় ছিল, তা তারা জানাননি।

প্রথমে গণমাধ্যমের কাছে দীপ দাবি করেছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলের সমস্যা হওয়ায় তারা একটি ওয়ার্কশপে যান। সেখানে মোটরসাইকেল মেরামত ও তেল পরিবর্তন করানো হয়। কোনও কোনও বক্তব্যে শপিংমলে যাওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। এরপর উত্তরার একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খান।

তবে ওই ওয়ার্কশপের নাম, অবস্থান, সেখানে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় কিংবা মেরামতের কোনও তথ্য পাওয়া গেছে কি না জানায়নি পুলিশ। মোটরসাইকেল মেরামতের সঙ্গে জড়িত কর্মীদের বক্তব্যও নিতে পারেন তদন্তে সংশ্লিষ্টরা। মোটরসাইকেল মেরামতের তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফের প্রথম গন্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।

রাত ১০টা ১৭ মিনিট: রেস্টুরেন্টে তাহসিফ, দীপ ও এক তরুণী

তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে প্রকাশিত তথ্য। সেই বর্ণনা অনুযায়ী, রাত ১০টা ১৭ মিনিটে এক তরুণীকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছান তাহসিফ। কিছুক্ষণ পর পৃথক মোটরসাইকেলে আসেন দীপ। পরে তিনজনকে একসঙ্গে লিফটে উঠতে দেখা যায়।

প্রকাশিত আরেকটি ফুটেজের তথ্য অনুযায়ী রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাদের রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এতে জানা যায়, সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করেছিলেন তারা। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে ওই তরুণীকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর দিকে যান। তবে এই যাত্রাপথের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা।

এদিকে ঘটনার পর দীপ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, উত্তরার আশকোনা এলাকার একটি শপিং কমপ্লেক্সে অবস্থিত ‘কুক কুক’ রেস্টুরেন্টে তারা রাতের খাবার খান। অন্যদিকে রাত ১১টা ৫৪ মিনিটেও রেস্টুরেন্টে তাহসিফ ও দীপের অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, তারা কি একই রাতে একাধিক রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন?

একই সঙ্গে ওই তরুণীর পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তদন্তে সংশ্লিষ্টরা। কারণ তাহসিফের মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে তার বক্তব্য জরুরি। তিনি কখন তাহসিফের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন, রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে কোথায় গিয়েছিলেন এবং তাকে নামিয়ে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ কোন পথে যান— এসব তথ্য গভীর রাতের গতিবিধি নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।

রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১টা ৩৫ মিনিট: কোথায় ছিলেন তাহসিফ?

এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই সবচেয়ে বেশি অসংগতি সামনে এসেছে। ঘটনার পর বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সাংবাদিকদের দীপ জানিয়েছিলেন, রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে উত্তরার হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি। এরপর নিজের বাসায় ফিরে যান। তাহসিফ কোথায় গিয়েছিলেন, তা তার জানা নেই। কিন্তু পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে তার বক্তব্য পাল্টে যায়। তখন তিনি জানান, রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পরও তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন। দুজনে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। দীপের এই বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের বিষয়ে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মাজার বস্তিতে যাওয়ার পরিকল্পনা কখন হয়েছিল? সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং অন্য কারও সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছিল কি না। এর মধ্যে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের মায়ের কাছে মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস মেসেজ আসে। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে তাহসিফ বলেন, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি’। এসব বিষয়ে তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন।

এই বার্তার সময়টি তদন্তে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তখন তাহসিফ কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে ছিলেন এবং কোন জায়গা থেকে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা বলেছিলেন, তা এখনও পরিষ্কার নয়। বার্তাটি সরাসরি রেকর্ড করে পাঠানো হয়েছিল, নাকি আগে ধারণ করা কোনও অডিও ব্যবহার করা হয়েছিল। ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষায় সেটিও যাচাই করবে তদন্ত সংস্থাগুলো।

মধ্যরাতের পর মাজার বস্তি থেকে নদীর পাড়

পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মধ্যরাতের পর তাহসিফকে নিয়ে তিনি টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। একপর্যায়ে কয়েকজন ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেন। ধাওয়াকারীদের মধ্যে দুজনের পরনে পুলিশের পোশাক ছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। দীপের ভাষ্য, ওই ব্যক্তিদের দেখে তাহসিফ দৌড় দেন এবং একপর্যায়ে তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। অন্যদিকে তিনি বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। পরে তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে সেখান থেকে চলে যান। তবে পুলিশ বলছে, এসব বক্তব্য তারা খতিয়ে দেখবে। পাশাপাশি তাহসিফ যদি নদীতে ঝাঁপ দিয়েই থাকেন, তাহলে সেই মুহূর্তে দীপ কী করেছিলেন? সাহায্যের জন্য কাউকে ডেকেছিলেন কি না, পুলিশ বা জরুরি সেবায় খবর দিয়েছিলেন কি না, সেই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে দীপকে।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দীপকে সঙ্গে নিয়ে মাজার বস্তি ও নদীতীরবর্তী এলাকা পরিদর্শন করেন পিবিআই কর্মকর্তারা। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন কালো সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়— যা তাহসিফের ব্যবহৃত বলে জানানো হয়েছে। তাহসিফের মোটরসাইকেল সেখানে কীভাবে পৌঁছেছিল, কে সেটি সর্বশেষ চালিয়েছিলেন এবং নদীর পাড় থেকে সেটির দূরত্ব কতটা—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে।

বাবার প্রশ্ন, তদন্তে পুলিশের অবস্থান

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম মনে করছেন, দীপের দেওয়া বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে গুরুতর অসংগতি রয়েছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) উত্তরার বাসায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘‘দীপ যা বলেছে এবং করেছে, সেগুলো আসলে প্রশ্নবিদ্ধ। এর সঙ্গে কে জড়িত বা কে কী করেছে, আমি বুঝতে পারছি না।’’ তিনি বলেন, দীপ তাদের পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাকে নিজের ছোট ছেলের মতো দেখতেন। অথচ ছেলেকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর তাহসিফ আর ফিরে আসেননি।

নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, পিবিআই ও নৌ পুলিশের তদন্তে পাওয়া তথ্য যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান না তারা।

আদালতে দুই পক্ষের ভিন্ন বক্তব্য

শনিবার (৩১ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে দীপকে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চান তদন্ত কর্মকর্তা নৌ পুলিশের পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন। আবেদনে দীপের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার দাবি করা হয়। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার শুনানিতে প্রশ্ন তোলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও প্রকাশের সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না।

অন্যদিকে দীপের আইনজীবী মনিরুল ইসলাম ও মুতাসিম বিল্লাহ তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাদের দাবি, দীপ শুরু থেকেই তদন্তে সহযোগিতা করছেন এবং তাকে ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ শিকার করা হচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তারাও নিরপেক্ষ তদন্তের পক্ষে।

সিসিটিভি, ফোনের লোকেশনেই মিলতে পারে উত্তর

তাহসিফের শেষ সাত ঘণ্টার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরিতে বাসার গ্যারেজ, সম্ভাব্য ওয়ার্কশপ, রেস্টুরেন্ট, হাউজবিল্ডিং এলাকা, টঙ্গীগামী সড়ক এবং মাজার বস্তির আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি তাহসিফ ও দীপের মোবাইল ফোনের অবস্থান, কললিস্ট, ডিজিটাল বার্তা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Keep Up to Date with the Most Important News

By pressing the Subscribe button, you confirm that you have read and are agreeing to our Privacy Policy and Terms of Use
Press Nation Bangladesh
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com