জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কৌশলগত নেতৃত্ব তৈরির আহ্বান রাষ্ট্রপতির

1793613165223086 1793613165223086
1793613165223086

উদীয়মান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখতে কৌশলগত নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা অবশ্যই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে পরিচালিত হতে হবে।

রোববার (২ নভেম্বর) বঙ্গভবনে ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬ এবং আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স-২০২৬-এর অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, জাতীয় মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই জাতীয় নীতি নির্ধারণের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুবিধার ভিত্তিতে অন্যান্য দেশের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে মানসম্মত নেতৃত্ব এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। এ লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

জাতীয় নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ

বর্তমান বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রচলিত নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার হুমকি, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, মহামারি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন।

তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সামরিক প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গোপসাগর ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে সতর্কতা ও দূরদর্শিতার গুরুত্ব অনেক বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তি যুদ্ধ এবং নিরাপত্তার প্রচলিত ধারণা পরিবর্তন করে দিচ্ছে। পাশাপাশি ভুল তথ্য, অপতথ্য ও সাইবার হুমকি জাতীয় নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৌশলগত দূরদর্শিতা, সঠিক বিচার-বিশ্লেষণ, বুদ্ধিবৃত্তিক উদারতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার সক্ষমতাসম্পন্ন নেতৃত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে শহীদদের স্মরণ

বক্তব্যের শুরুতে রাষ্ট্রপতি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁদের সাহস, আত্মত্যাগ ও অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করেন তিনি।

এ সময় মুক্তিযুদ্ধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের অবদান এবং স্বাধীনতার ঘোষণার কথা উল্লেখ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ১৯৭৭ সালে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পেশাদার সামরিক শিক্ষার প্রসারে জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং গত ১৭ বছরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারীদের স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি।

তিনি বলেন, জনগণের মর্যাদা সমুন্নত রাখা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ভূমিকা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সশস্ত্র বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে সমসাময়িক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অভিন্ন উপলব্ধি গড়ে উঠছে।

ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬ এবং আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স-২০২৬-এর অংশগ্রহণকারীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে স্থান দিতে হবে। একই সঙ্গে পেশাদারিত্ব, সততা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বজায় রাখতে হবে।

বিদেশি অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশে তাঁদের এই অভিজ্ঞতা নিজ নিজ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা জোরদারে সহায়ক হবে।

তিনি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, জাতিসমূহের মধ্যে বন্ধুত্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পৃক্ততার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা, মতবিরোধের পরিবর্তে সংলাপ এবং সংঘর্ষের পরিবর্তে শান্তির আহ্বান জানান তিনি।

এ ছাড়া সক্ষম ও দূরদর্শী নেতৃত্ব তৈরিতে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার জন্য ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. ফয়জুর রহমান।

এ সময় ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ফ্যাকাল্টি সদস্য, কোর্স সম্পন্নকারী সামরিক কর্মকর্তা, বিদেশি কোর্স সদস্য, সেনাবাহিনীর স্টাফ অফিসার, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (জেসিও) এবং বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬-এ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর ৫৪ জন, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ১৮ জন এবং বন্ধুপ্রতিম ১৭টি দেশের ৩১ জনসহ মোট ১০৩ জন অংশগ্রহণ করেন।

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Keep Up to Date with the Most Important News

By pressing the Subscribe button, you confirm that you have read and are agreeing to our Privacy Policy and Terms of Use
Press Nation Bangladesh
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com