মানুষের অসহায়ত্ব ছিল তার মূলধন, আর অলৌকিক ক্ষমতার গল্প ছিল প্রতারণার অস্ত্র। কখনো তান্ত্রিক পরিচয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, কখনো কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের সেবক হিসেবে। কবিরাজ অলৌকিক ক্ষমতার ধারণা তৈরি করতে হাড়, মাছ ও পাখির ভিডিও করতেন। এরপর পারিবারিক সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পেতেন।
তার বিরুদ্ধে অন্তত দুই শতাধিক লোকের টাকা চুরির অভিযোগ রয়েছে। তিনি এক নারীর কাছ থেকে সাড়ে ছয় লাখ টাকা নেন। টাকা ফেরত চাওয়ার সময় অলৌকিক ক্ষমতার ভয়ের কথা শুনতে হয়েছে ওই নারীকে। শেষ পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জামালপুরের কথিত তান্ত্রিক মো. মিজানুর রহমানকে (২৫) গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তার কাছ থেকে জালিয়াতিতে ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন ও একাধিক সিমকার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্রতারণার সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত। তাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী নুসরাত মরিয়ম (ছদ্মনাম) টিকটকে ‘তান্ত্রিক গুরু জীবন কবিরাজ’ নামে একটি অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা একটি ভিডিও দেখে পরিচালকের সাথে পরিচিত হন। পরে পারিবারিক সমস্যা সমাধানের আশায় ওই নারী তার সঙ্গে ইমু ও মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন। এরপর শুরু হয় প্রতারণা। মামলার অভিযোগে বলা হয়, কথিত তান্ত্রিক পারিবারিক সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কবিরাজির বিভিন্ন উপকরণ কেনার প্রতিশ্রুতি দেন। এভাবে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত বিকাশের মাধ্যমে ওই নারীর কাছ থেকে মোট ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ভুক্তভোগী টাকা ফেরত চায়। অভিযোগ, এরপর তাকে বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতার হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে আইনের আশ্রয় নেন।
মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই
পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবদুর রহমান জানান, গত ৪ জুলাই ভিকটিম বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। প্রায় তিন মাস পর গত ১০ অক্টোবর পিবিআই উত্তর বিভাগ নিজ উদ্যোগে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে। মামলাটি বর্তমানে উপ-পরিদর্শক (এসআই) তদন্ত করছেন। নাজমুল হক।
তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে ১৬ অক্টোবর ভোররাতে জামালপুরের চর যর্থপুর ভাটিপাড়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি অন্য সহযোগীদের নাম উল্লেখ করেছেন বলে পিবিআই জানিয়েছে।
শতাধিক মানুষের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবির হোসেন জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রটি মানুষের আবেগ ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে প্রতারণা করে আসছিল। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেন, অভিযুক্ত তান্ত্রিক অন্তত এক হাজার মানুষকে এভাবে প্রতারণার কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে অন্তত দুই শতাধিক তার কথা বিশ্বাস করে টাকা দিয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য সহযোগীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।