লাগেজ কাটা-চুরি বন্ধে নতুন ব্যবস্থা: কতটা বদলালো শাহজালাল বিমানবন্দর

Ae0f6a212aca30c3a1a357760a55d3a1 6ae47d4d1174a Ae0f6a212aca30c3a1a357760a55d3a1 6ae47d4d1174a
Ae0f6a212aca30c3a1a357760a55d3a1 6ae47d4d1174a

ডিআর কঙ্গো থেকে প্রায় এক বছর পর দেশে ফিরেছেন ফেনীর আসিফ আলী। কঙ্গোতে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিবছর একবার দেশে আসেন। প্রায় মাসখানেক থেকে আবার ফিরে যান আফ্রিকার দেশটিতে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন শেষ করে বেল্টে এসে দেখেন, তার লাগেজ ঠিকঠাকভাবেই সময়মতো চলে এসেছে।

কতক্ষণে লাগেজ পেয়েছেন, জানতে চাইলে আসিফ বলেন, ‘ইমিগ্রেশন শেষ করে বেল্টে এসে দেখি লাগেজ চলে এসেছে। এর আগে দেশে এসেও এত কম সময়ে কখনও লাগেজ পাইনি। বর্তমান ব্যবস্থাপনা দেখে ভালো লাগছে।’

তিনি বলেন, ‘কিছুদিন আগে ফেসবুকে দেখলাম, এয়ারপোর্টে লাগেজ কাটা নিয়ে এক প্রবাসী অনেক কান্নাকাটি করছেন। কিন্তু এখনকার ব্যবস্থাপনা ভালো। এই যে মনিটর, সেখানে দেখতে পাচ্ছি লাগেজ কোথায় আছে, কেউ হাত দিচ্ছে কিনা। আর দ্রুত লাগেজ চলে আসছে। আমার কাছে এই ব্যবস্থাপনা অনেক ভালো লেগেছে। এটা আরও আগে চালু করলে লাগেজ কাটা ও মালামাল হারানোর অভিযোগ থাকতো না। তারপরও এতদিন পর কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এতে আমি খুশি।’


শাহজালালের আটটি লাগেজ বেল্টে বসেছে ৩২টি ক্যামেরা। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

আসিফের ভাষায়, ‘দেখেন, একজন প্রবাসী পাঁচ-সাত বছর পর দেশে এলেন। বিমানবন্দরেই যদি তার মূল্যবান সামগ্রী চুরি হয়, তাহলে তার কষ্ট শুধু যার সঙ্গে ঘটেছে, সেই বুঝবেন। অন্য কেউ বুঝবেন না। সুতরাং কর্তৃপক্ষ একটা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

বেল্ট থেকে লাগেজ নেওয়ার সময় কথা হয় ওমরাহ করে ফেরা নোয়াখালীর নোয়াব আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের লাগেজ পেতে কোনও সমস্যা হয়নি। আমরা এতগুলো লোক এলাম, খুব সহজেই সবার লাগেজ পেয়েছি। ইমিগ্রেশন শেষ করে বেল্টে দাঁড়িয়ে চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যে লাগেজ চলে এসেছে। বিমান থেকে নেমে ইমিগ্রেশন শেষ করে কোনও ঝামেলা ছাড়াই লাগেজ পেয়েছি।’

নোয়াব আলী বলেন, ‘টিভিতে দেখা যাচ্ছে সবার ব্যাগ আসছে। এটা ভালো হয়েছে। কেউ যেন হাত দিতে না পারে। হাত দিলে কে হাত দিয়েছে, সেটি ভিডিওতে দেখা যাবে। খুব ভালো করেছে। লাগেজ কাটা, চুরি এগুলো আর থাকবে না।’

ওমরাহ থেকে ফেরা রাশেদা বেগমও জানান, লাগেজ পেতে কোনও সমস্যায় পড়েননি তারা। তিনি বলেন, ‘সবকিছু ঠিকঠাক রয়েছে। লোকজনের মুখে শুনেছি, এয়ারপোর্টে লাগেজ কাটা হয়, মালামাল চুরি হয়। কিন্তু আমাদের কোনও সমস্যা হয়নি। আমরা সময়মতো সবকিছু পেয়েছি।’


লাগেজ বেল্টে নতুন চিত্র

মনিটরে লাগেজের গতিবিধি দেখতে পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে রাশেদা বেগম বলেন, ‘মনিটরে সব দেখা যাচ্ছে। বেল্ট দিয়ে লাগেজ আসছে। এ রকম ব্যবস্থা সবসময় থাকলে কারও লাগেজ চুরি হবে না। কেউ কাটার সাহসও দেখাবে না।’

আসিফ, নোয়াব কিংবা রাশেদা—দেশে আসা যাত্রীদের অনেকেই বিমানবন্দরের লাগেজ ব্যবস্থাপনায় নতুন এই উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা আগে চালু করা হলে বিমানবন্দরের কর্মীদের বিরুদ্ধে লাগেজ কাটা ও মালামাল চুরির অভিযোগ ওঠার সুযোগ কম থাকত। দেরিতে হলেও এমন ব্যবস্থা নেওয়ায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, লাগেজ হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে সিসিটিভি ক্যামেরা ও মনিটর স্থাপনের পর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। উড়োজাহাজ থেকে নামানো লাগেজ সারিবদ্ধভাবে বেল্টে আসছে। যাত্রীরা সেখান থেকে নিজেদের ব্যাগ সংগ্রহ করছেন। আগের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। লাগেজ কোথায় আছে, সেটিও মনিটরে দেখতে পাচ্ছেন তারা। এতে লাগেজ কাটা বা মালামাল হারানোর আশঙ্কা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে যে দুশ্চিন্তা ছিল, তা অনেকটাই কমেছে।

জানা যায়, গত ১৭ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ হ্যান্ডলিং কার্যক্রম সরাসরি দেখার ব্যবস্থা চালু করে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। বিমানবন্দরের আটটি লাগেজ বেল্ট এলাকায় ৩২টি সিসিটিভি ক্যামেরা ও ৬৫ ইঞ্চির ১৮টি মনিটর স্থাপন করা হয়। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো থেকে শুরু করে বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ সরাসরি দেখতে পারছেন যাত্রীরা।

বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদ জানান, লাগেজ ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে যাত্রীরা তাদের লাগেজ কোথায় আছে এবং কোনও সমস্যা হয়েছে কিনা, তা সরাসরি দেখতে পারবেন।


নিজেদের লাগেজ ক্যামেরায় সরাসরি দেখতে পারছেন যাত্রীরা। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

বেবিচক জানায়, প্রতিটি লাগেজ বেল্টের ব্যাগেজ এলাকায় চারটি করে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে লাগেজ নামানো, পরিবহন, বাছাই এবং বেল্টে পৌঁছানোর দৃশ্য মনিটরে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে।

এর আগে লাগেজ হারানো, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কাটা ও চুরির ঘটনা প্রতিরোধে উচ্চপর্যায়ের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এই কমিটি গঠন করে। গত ১০ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের আইন-১ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়। ছয় সদস্যের কমিটি তদন্ত ও মূল্যায়ন শেষে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একাধিক সুপারিশ করে।

কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান। সদস্য হিসেবে ছিলেন বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারলাইন অপারেটরস কমিটির (এওসি) চেয়ারম্যান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাহক সেবা ও কার্গো বিভাগের পরিচালক এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের পরিচালক।

কমিটির ছয় দফা সুপারিশের মধ্যে ছিল, উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো থেকে শুরু করে আগমন এলাকার লাগেজ বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া সিসিটিভির আওতাবহির্ভূত এলাকা চিহ্নিত করে ক্যামেরা স্থাপন, লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে নিয়োজিত কর্মীদের শরীরে ক্যামেরা চালু রাখা এবং সংগৃহীত ফুটেজ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়।

কমিটি প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং কর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তি, নিরাপদ লাগেজ ব্যবস্থাপনা ও মানসম্মত পরিচালন পদ্ধতি বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেয়।

সুপারিশে বলা হয়, যাত্রার মূল বা ট্রানজিট বিমানবন্দরে কোনও ব্যাগ কাটা, খোলা বা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই আগাম সতর্কবার্তা ও ই-মেইলের মাধ্যমে ছবি পাঠাতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাগে পরিচিতি-স্টিকার লাগাতে হবে।


নতুন ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট যাত্রীরা। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

লাগেজ চুরি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, সিসিটিভি ও শরীরে ধারণ করা ক্যামেরার ফুটেজ নিয়মিত নিরীক্ষা এবং আকস্মিক পরিদর্শনের সুপারিশও করে কমিটি। পাশাপাশি মূল্যবান সামগ্রী লাগেজে না রাখা নিয়ে যাত্রীদের সচেতন করতে প্রচারণা চালানো এবং সঠিক তথ্য প্রচারে নিজস্ব জনসংযোগ দল বা গণমাধ্যম সেল গঠনের কথা বলা হয়। প্রমাণ বা যাচাই ছাড়া নেতিবাচক ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও ছিল।

বেবিচক জানিয়েছে, যাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষা, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর ও যাত্রীবান্ধব সেবা সম্প্রসারণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বলেন, এই ব্যবস্থা চালুর ফলে যাত্রীদের লাগেজ কাটার অভিযোগ শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। অনেক সময় লাগেজে অনুমোদিত নয় এমন জিনিসপত্র বহনের কারণে যাত্রীরা যে বিমানবন্দর থেকে আসছেন, সেখানে ব্যাগ কেটে সেসব জিনিস রেখে দেওয়া হয়। পরে তারা এ বিমানবন্দরে নেমে লাগেজ কাটার অভিযোগ করেন। কিন্তু এখনকার ব্যবস্থায় এ ধরনের অভিযোগ তোলার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, লাগেজ ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালনকারীদের শরীরে ধারণ করা ক্যামেরাও রয়েছে। সুতরাং বিমানবন্দরে লাগেজ নিয়ে আর হয়রানি হবে না।

বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল বলেন, ‘যাত্রী ও তাদের মালামালের নিরাপত্তায় লাইভ সিসিটিভি ফুটেজ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাত্রীরা উড়োজাহাজ থেকে নেমে ইমিগ্রেশন শেষ করে বেল্টে এলে নিজেরাই দেখতে পাচ্ছেন তাদের লাগেজ কোথায় আছে। বর্তমানে লাগেজ পেতেও দেরি হচ্ছে না।’ এতে করে বিমানবন্দরের প্রতি যাত্রীদের আস্থা বাড়ছে বলেও মনে করেন তিনি।

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Keep Up to Date with the Most Important News

By pressing the Subscribe button, you confirm that you have read and are agreeing to our Privacy Policy and Terms of Use
Press Nation Bangladesh
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com