ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নানা অব্যবস্থাপনা, ময়লার ভাগাড়ে ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম পড়ে থাকা এবং চিকিৎসক-নার্সদের সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিত না হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সর্দার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। হাসপাতালের ময়লার ভাগাড়ে ক্যানুলা, সিরিঞ্জসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম পাওয়ার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মন্ত্রী।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দেখতে পান তিনি।
হাসপাতালের পরিবেশ ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে ক্ষোভ
পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ড, হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড ও ডেঙ্গু ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন। এ সময় তিনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা, ওয়ার্ডের পরিবেশ এবং ওয়াশরুমের পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচতলায় ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। এ ছাড়া হাসপাতালের ব্যবহৃত ক্যানুলা, সিরিঞ্জ ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম ময়লার ভাগাড়ে পড়ে থাকার ঘটনায় উদ্বেগ জানান তিনি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিত না হওয়ার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
রোগীকে বাইরে থেকে স্যালাইন কিনতে দেওয়ায় প্রশ্ন
হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক রোগীকে বাইরে থেকে স্যালাইন কিনে আনতে হয়েছে কেন, তা জানতে চান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীকে কেন বাইরে থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে হবে, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চান তিনি।
এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন মন্ত্রী। পাশাপাশি ওই রোগীকে স্যালাইন কেনার জন্য এক হাজার টাকা দেন তিনি।
অন্যদিকে, হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের এক মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাইলে ছুটির কারণে প্রতিবেদন জমা দিতে দেরি হয়েছে বলে জানানো হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫১ শয্যা করার পরিকল্পনা
এর আগে শনিবার সকালে ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আকস্মিক পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় তিনি উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
মন্ত্রী জানান, ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে বড় পরিসরে দরপত্র আহ্বান করা হবে। এ খাতে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি ও রোবটিক সার্জারির উদ্যোগ
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে রেডিওথেরাপি মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পাঁচটি রোবটিক সার্জারি ব্যবস্থা আনা এবং পাঁচ হাজার নার্স নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, মিডওয়াইফ নিয়োগের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এ ছাড়া পুরোনো কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি ওয়েলবিং সেন্টারে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী।
পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিদর্শনকালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হোসেন, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা, জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান এবং জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনে উঠে আসা অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্ত করে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।