বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাওসিফ সৌরির লাশ নিখোঁজের পরদিন তুরাগ নদ থেকে উদ্ধারের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও তোলপাড় শুরু হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় গণভবনের পেছন থেকে ধারণকৃত বহুল আলোচিত ভিডিওটি প্রকাশের পেছনে তাওসিফ সৌরির ভূমিকা ছিল— এমন জল্পনা-কল্পনার জের ধরে তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ দানা বাঁধছে।
ভিডিও ফাঁসের জের ও রাজনৈতিক সন্দেহ
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের একটি অংশ দাবি করছেন, ৫ আগস্টের ভিডিও ভাইরাল বা ফাঁসের পেছনে তাওসিফ সৌরির সম্পৃক্ততা ছিল। তার সাবেক সহপাঠী ও পরিচিত অনেকে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা বা ব্যক্তিগত কোন্দল না হলে এর পেছনে রাজনৈতিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনও কারণ থাকতে পারে।
কেএসএম ইনতিসার ইনজিমাম নামের একজন সহপাঠী যিনি আদমজী কলেজে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন ও পরে ৭৯ বিএমএ ইক্যুইভ্যালেন্ট কোর্সমেট হিসাবে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে জয়েন্ট সার্ভিস কোর্স করেন বলে উল্লেখ করেছেন। ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। হাসিনার ভিডিও ভাইরাল করার সাথে জড়িত এই ছেলেটার লাশ আজকে তুরাগ নদীতে ভেসে আসছে।’
তিনি লেখেন, ‘গত পরশু রাতে সে বাইরে যায় এরপর এই ঘটনা। তার লাশের ছবিতে হাতে কাদা মাখা। বাকি সব ক্লিন, এটা কিসের লক্ষণ আমি এখনি বলতে চাইনা। তবে এটা ব্যক্তিগত কোনও কোন্দল বা এক্সিডেন্ট ক্লিয়ারলি প্রমাণিত না হলে, আমি ধরে নেবো এটা পলিটিকাল।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘৫ আগস্টের ভিডিও ফাঁস হওয়ার পর, তার মানহানি করা হয় নানা বিষয়ে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনও পুলিশি কেস করতে পারে নাই আমার জানা মতে। যদিও বহু মানহানি করা হয়েছিল। তাই আমার বিশ্বাস সব কিছু সেই হাসিনার হেলিকপ্টারের ভিডিও ফাঁসের সাথে কানেক্টেড। কারণ ৫ই আগস্টের ঘটনার আগেও ফ্যালকনে এই তার ১ সপ্তাহ আগে আমার সাথে দেখা হয়, সে সাধারণ ডিউটি করছিল।’
তবে প্রমাণের আগে ৫ আগস্টের ভিডিওর সাথে সরাসরি মৃত্যুর যোগসূত্র টানা ঠিক হবে না বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন।
স্বচ্ছ তদন্ত ও তথ্য সংরক্ষণের দাবি
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহাসহ অনেকে ফেসবুকে লিখেছেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তের সুবিধার্থে নিহতের শেষ চলাচলের সিসিটিভি ফুটেজ, কল ডিটেইলস (সিডিআর) ও শেষ মুহূর্তের অন্যান্য আলামত দ্রুত সংরক্ষণের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে তিনি লেখেন, ‘অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্টকে এম তাহসিফ সাউরির নিখোঁজ হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। খবরটির আনুষ্ঠানিক সত্যতা ও বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত জানানো প্রয়োজন।
‘ঘটনা সত্য হলে, তার মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, সেটি জানতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত চাই। ময়নাতদন্তের পাশাপাশি শেষ চলাচলের সিসিটিভি, ফোনের তথ্য এবং সম্ভাব্য হুমকির আলামত দ্রুত সংরক্ষণ করা জরুরি।
‘তাঁর সঙ্গে আলোচিত ভিডিও প্রকাশের যে সম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে, সেটিও যাচাই করা হোক। তবে প্রমাণের আগে মৃত্যুর সঙ্গে সেই ঘটনার যোগসূত্র টানা ঠিক হবে না।
‘একজন মানুষ সম্পর্কে কার কী রাজনৈতিক মূল্যায়ন, তার ওপর তাঁর মৃত্যুর সত্য জানার অধিকার নির্ভর করে না। পরিবার উত্তর পাওয়ার অধিকার রাখে। তদন্তের অগ্রগতি জনসমক্ষে জানানো হোক।’
চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা ও রহস্যময় মৃত্যু
অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তার ফেসবুকে উল্লেখ করেছেন, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বিমান বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হওয়া চার কর্মকর্তার মধ্যে তাহসিফ সুরিও একজন ছিলেন। তিনি আরও জানান, প্রাথমিকে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ধারণা করা হলেও ময়নাতদন্তের পরই প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
উত্তরখান ও টেনজি নৌ পুলিশ ফাঁড়ি সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাত থেকে নিখোঁজ থাকার পর ২৮ অক্টোবর বিকালে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।