‘মা কেঁদো না, বাবা আকাশের তারা হয়ে গেছেন’

Be810b2fcf1fd373828e0b8b3322afbc 6ad43e54889d4 Be810b2fcf1fd373828e0b8b3322afbc 6ad43e54889d4
Be810b2fcf1fd373828e0b8b3322afbc 6ad43e54889d4

‘মা তুমি কাঁদো না। বাবা আকাশের তারা হয়ে গেছেন, কদিন পর ফিরবেন।’ চার বছরের শিশু প্রান্তি জানে না তার বাবা আর ফিরবেন না। পিতৃহীন হওয়ার যন্ত্রণা বোঝার বয়স না হলেও মায়ের কান্না দেখে সান্ত্বনা দেওয়ার এই ইচ্ছা সত্যিই হৃদয়বিদারক।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে দুর্গাপুরের একটি গ্রামের বাড়িতে এ দৃশ্য দেখা যায়।

মেয়ের এমন কথা শুনে কান্না ধরে রাখতে পারেননি সাংবাদিক আলিফের স্ত্রী আমেদিয়া সাংমা। যে বয়সে প্রান্তির বাবার কোলে চড়ে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে বাবাকে হারিয়ে কাঁদতে থাকা মাকে সান্ত্বনা দিতে হয়।

“মেয়েটির মুখ থেকে এই কথাগুলো শুনে হৃদয় ফেটে যায়,” বললেন অমেদ। তার বাবা যে আর ফিরে আসবে না তা বোঝার বয়স এখনো হয়নি তার। ওর কথা শুনে আমার কান্না দ্বিগুণ হয়ে গেল। আমার কি হবে? আমার সন্তানদের কি হবে? আমার মা বিধবা! আমার বড় বোন বিধবা! সন্ত্রাসীরা আমাকেও বিধবা করেছে!’

প্রান্তির ছোট ভাই আয়ান সাফিয়ানের বয়স মাত্র দেড় বছর। তার বাবার মৃত্যুর অর্থ বোঝার মতো বয়স হয়নি। বাবাকে কাছে না পেয়ে দুদিন ধরে কাঁদছে সে। শিশুটি বাবাকে ডাকতে শিখেছে, কিন্তু শিশুটি বুঝতে পারেনি যে বাবা কখনই তার ডাকে সাড়া দেবেন না। এই দুই সন্তান নিয়ে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি জয়দা। স্বামী হারানোর শোক ছাড়াও, কীভাবে তার দুই সন্তানকে বড় করবেন, কীভাবে তাদের বাবার অভাব পূরণ করবেন – এই প্রশ্নগুলি তাকে এখন তাড়া করছে।

স্বামীকে হারানোর পর তার স্বামীকে ‘সুপারহিরো’ বলে প্রশংসা করে আমেদ্যা বলেন, ‘আমার স্বামী আমার কাছে সুপারম্যান ছিলেন। আমি জানি না যে কেউ তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে। কিন্তু সে সবসময় আমার কাছে সুপারহিরো হয়ে থাকবে।’

কান্নাজড়িত কন্ঠে বললেন, বিয়ের পর থেকে এক রাতও আমাকে ছাড়া থাকতে পারেনি। প্রতিদিন আমার মুখে ভাত দিতেন। আমি নিজের হাতে খাইনি, তার হাতেই খেয়েছি। আমার পড়ালেখায়ও তার অবদান ছিল। আমি নার্সিং পাশ করেছি। আমার চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে বলেও বলছিল। কিন্তু এখন শেষ।’

অঞ্জাদিয়া জানায়, ঢাকা বা সিলেটে চাকরি পেলে স্বামী-সন্তানসহ দুর্গাপুর ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।

স্বামীর হত্যার বিচার চাওয়ার পাশাপাশি অমেদিয়া তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। তিনি বলেন, ‘বাবা-মা ছাড়া সন্তানদের মানুষ করব কী করে? আলিফ ছেলে মেয়েদের খুব ভালোবাসতো। বাবার আদর তারা আর পাবে না।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘যারা আমার সন্তানদের এতিম করেছে, বাবার আদর থেকে বঞ্চিত করেছে, আমি তাদের কঠিন শাস্তি দেখতে চাই। খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার করা হোক।’

আলিফের বড় বোন কল্পনা আক্তারও সরকারের কাছে খুনিদের বিচারের পাশাপাশি তার স্ত্রী ও সন্তানদের সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তাঁর ভাইয়ের স্ত্রী নার্সিং নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। চাকরি পেলে দুই সন্তানকে মানুষ করা সহজ হবে।’

আলিফের শাশুড়ি শীলা রাংসাও একই উদ্বেগের প্রতিধ্বনি। তিনি বলেন, ‘আমার জামাইকে এত গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এখন বিচার চাইব কার কাছে? আমার মেয়ে দুটি ছোট বাচ্চা নিয়ে কীভাবে বাঁচবে? আমিও গরীব।’

আলিফ হত্যার নেপথ্যে কী আছে?

আলিফের পরিবারের সদস্যরা তাকে হত্যার পেছনে তার সাংবাদিকতাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন। অমেদিতা বলেন, আলিফ অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে লিখতেন। বাড়িতে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় তিনি তাকে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে শুনেছেন। তখন তিনি বুঝতে পারেন, আলিফকে অনেকেই হুমকি দিত।

আলিফের বড় ভাই শহিদুল ইসলাম ফকির আরও বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তার ভাই অনেক শত্রু তৈরি করেছে। আলিফ তার ভাষ্যে সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালান, চাঁদাবাজি, অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা লিখেছেন। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। এ কারণে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা। পরিবারের সদস্যদের এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলিফের ওপর আগের হামলার ঘটনাও সামনে আসে।

এক বছর আগে কাটার চোট

স্বজনদের দেওয়া তথ্যমতে, গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর টেরিবাজার ঘাট এলাকায় আলিফকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এসময় তার সাথে থাকা এক সহকর্মী তাকে থামানোর চেষ্টা করলে তাকেও অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করা হয়। ওই ঘটনায় আলিফ বাদী হয়ে মামলা করেন। পুলিশ অভিযুক্ত দুইজনকে গ্রেপ্তারও করেছে। বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছেন। এক বছরেরও কম সময় পরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

আলিফের মামা বিশু সাংমা জানান, ঘটনার সময় তারা বাড়ির বাইরে বসে কথা বলছিলেন। বিকট শব্দ শুনে তিনি চায়ের দোকানে গিয়ে আলিফকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।

তার ভাষ্য, ‘শুনেছি দুজন শুটিং করছে আর দুজন কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। আমরা সবাই এগিয়ে আসার আগেই হামলাকারীরা চলে যায়।’

ঘটনাস্থল থেকে আলিফের শ্বশুর বাড়ি প্রায় ৩০ গজ দূরে। চায়ের দোকানের সামনে এখনো শুকনো রক্তের দাগ।

সামনে থেকে গুলি

ময়নাতদন্তের তথ্যেও খুনের ভয়াবহতা জানা গেছে। নেত্রকোনার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালে আলিফের ময়নাতদন্ত করা হয়।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধানন্দ নাথ জানান, আলিফের বুকে তিনটি গুলির আঘাত রয়েছে। এর মধ্যে দুটি গুলি শরীর দিয়ে চলে গেছে। আরেকজন পিঠের ভিতরে আটকা পড়েছিল। এছাড়া একটি গুলি কপালের ডান দিক দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। আরও দুটি গুলি বেরিয়ে গেছে একটি মাথার উপরের চামড়া দিয়ে এবং অন্যটি ডান কাঁধের পাশ দিয়ে। ক্ষতের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকের প্রাথমিক ধারণা, আলিফকে সামনে থেকে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছে।

অর্থাৎ ঘটনাটি কোনো এলোমেলো বন্দুকযুদ্ধ নয়, তাকে গুলি করা হতে পারে। তবে হত্যার উদ্দেশ্য, হামলাকারীদের পরিচয় ও পরিকল্পনা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

আগের হত্যা মামলাগুলোর বিচার নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে

আলিফের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে দুর্গাপুরে বহু খুনের ঘটনা ঘটলেও এখনও পর্যন্ত অনেকের বিচার হয়নি। শীলা রাংসা বলেন, সোমেশ্বরী নদীর ঘাটে মজিবুর নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা, দুর্গাপুর বাজারে এক পুলিশ কর্মকর্তা হত্যা এবং উপজাতীয় নেতা ও কুল্লাগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমা হত্যার মতো মামলায় তারা ন্যায়বিচারে হতাশ। এ প্রেক্ষাপটে আলিফ হত্যার বিচার নিয়ে উদ্বিগ্ন তার পরিবার।

তাদের প্রশ্ন অন্যান্য মামলার মতো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি হত্যাকাণ্ডও কি দমন হবে নাকি এবার খুনিদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে?

মামলা হয়েছে, একাধিক সংস্থা তদন্ত করছে

আলিফ হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী আমেদিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় সাত থেকে আটজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ খান জানান, আসামিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম জানান, সাংবাদিক আলিফ হত্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশ, এসআরবিসহ একাধিক সংস্থা কাজ করছে। খুব শিগগিরই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে হত্যার মূল কারণ, হামলাকারীদের পরিচয় বা কারা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে সে বিষয়ে এখনো কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

শোকে দুই শিশু, সামনে দীর্ঘ লড়াই

কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনি গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে আলিফ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য ছিলেন। অবসরের পর সাংবাদিকতায় যোগ দেন। পরে সাংমাকে বিয়ে করে দুর্গাপুরের তেলঞ্জিয়ায় বসবাস করছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলঞ্জিয়া এলাকায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেলস’ নামে একটি ফেসবুক পেজও পরিচালনা করেন। সেখানে তিনি অনিয়ম, অপরাধ, মাদক ও চোরাচালানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিও লিখে প্রকাশ করতেন।

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Press Nation Bangladesh