শেখ মুজিবুর রহমান কে? তাঁর জন্ম, পরিবার, শিক্ষা, ভাষা আন্দোলন, ঐতিহাসিক ৬ দফা, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কার্যক্রম এবং মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।
শেখ মুজিবুর রহমান (১৭ মার্চ ১৯২০ – ১৫ আগস্ট ১৯৭৫) বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও জাতির পিতা। জনসাধারণের কাছে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘শেখ মুজিব’ নামে সমধিক পরিচিত। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পাকিস্তান আমলে বাঙালি জাতির অধিকার আদায় এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ও সর্বেসর্বা নেতৃত্ব প্রদান করেন। ২০০৪ সালে বিবিসি কর্তৃক পরিচালিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জরিপে তিনি শীর্ষস্থান অর্জন করেছিলেন।
জন্ম তারিখ: ১৭ মার্চ ১৯২০
জন্মস্থান: টুঙ্গিপাড়া গ্রাম, গোপালগঞ্জ মহকুমা (তৎকালীন ফরিদপুর জেলা, ব্রিটিশ ভারত)
পিতা: শেখ লুৎফর রহমান
মাতা: বেগম ফজিলাতুন্নেছা (সাহারা খাতুন)
পারিবারিক পরিচিতি: পিতামাতা তাঁকে স্নেহের বশে ‘খোকা’ বলে ডাকতেন। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়।
দাম্পত্য জীবন: ১৯৩৮ সালে তিনি বেগম ফজিলাতুন্নেছার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির ঘরে তিন ছেলে (শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল) এবং দুই মেয়ে (শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা) জন্মগ্রহণ করেন।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা: টুঙ্গিপাড়ার গিমাডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু। পরবর্তীতে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল ও গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। ১৯৩৪ সালে চোখে জটিল রোগের কারণে তাঁর পড়াশোনায় সাময়িক বিরতি ঘটে।
উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক: ১৯৪২ সালে এন্ট্রান্স বা প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি কলকাতার বিখ্যাত ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মাওলানা আজাদ কলেজ) ভর্তি হন এবং কলেজটির বেকার হোস্টেলে বসবাস করতেন। ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামিয়া কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব আর্টস (BA) ডিগ্রি লাভ করেন।
ছাত্ররাজনীতি: কলকাতা ও পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
শেখ মুজিব তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি দীর্ঘ সময় (প্রায় ১৩ বছর) বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কারাবরণ করেছেন।
ভাষা আন্দোলন (১৯৫২): ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে তিনি কারাবন্দি থাকা অবস্থায় ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে একটানা ১৩ দিন অনশন ধর্মঘট পালন করেন।
যুক্তফ্রন্ট ও মন্ত্রীসভা (১৯৫৪): ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর তিনি প্রাদেশিক মন্ত্রীসভার সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬6): ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অর্জনের লক্ষ্যে ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা দাবি’ পেশ করেন, যাকে পাকিস্তান সরকার বিচ্ছিন্নতাবাদী চক্রান্ত হিসেবে অভিহিত করে।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (১৯৬৮): ছয় দফা আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানি সরকার তাঁকে প্রধান আসামি করে তথাকথিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করে।
গণঅভ্যুত্থান ও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি (১৯৬৯): দেশব্যাপী তীব্র ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মুখে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয়ে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে তাঁকে সসম্মানে মুক্তি দেয়। ওই বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক বিশাল ছাত্রসমাবেশে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
৭০-এর নির্বাচন: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে।
ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ: ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ও তেজস্বী ভাষণে ঘোষণা করেন— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এই ভাষণ ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি লাভ করেছে।
স্বাধীনতার ঘোষণা ও গ্রেপ্তার: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঢাকাসহ সারাদেশে গণহত্যা শুরু করলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর তাঁকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি করে রাখা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা: তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধান করে গঠিত মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে পা রাখেন, যা ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
সরকার গঠন: তিনি প্রথমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
সংবিধান প্রণয়ন ও কূটনীতি: স্বাধীনতার মাত্র দশ মাসের মধ্যে তাঁর সরকারের উদ্যোগে দেশের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়। তাঁর বৈদেশিক নীতির মূল মন্ত্র ছিল— “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়”। স্বল্প সময়ে তিনি ১৪০টির বেশি দেশের স্বীকৃতি আদায় করেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন, চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবেলার এক পর্যায়ে ১৯৭৫ সালের বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের সামরিক অভ্যুত্থানে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে তিনি সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন। কেবল তাঁর দুই কন্যা (শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা) সেসময় বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।
| বিষয় | তথ্য |
| পূর্ণ নাম | শেখ মুজিবুর রহমান |
| জন্ম তারিখ | ১৭ মার্চ ১৯২০ |
| জন্মস্থান | টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ |
| পিতা-মাতা | পিতা: শেখ লুৎফর রহমান, মাতা: বেগম ফজিলাতুন্নেছা |
| স্ত্রী | বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব |
| সন্তান | শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা |
| উপাধি | বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা |
| রাজনৈতিক দল | বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ |
| দায়িত্ব পালন | প্রথম রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী (বাংলাদেশ) |
| মৃত্যু তারিখ | ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ (সপরিবারে নিহত) |
প্রশ্ন ১: শেখ মুজিবুর রহমান কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: তিনি ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন।
প্রশ্ন ২: তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি কবে ও কে প্রদান করেন?
উত্তর: ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ডাকসু ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের আয়োজনে রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল গণসংবর্ধনায় তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
প্রশ্ন ৩: শেখ মুজিবুর রহমান কবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন?
উত্তর: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে (২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে) পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
প্রশ্ন ৪: তাঁর জীবনাবসান ঘটে কীভাবে?
উত্তর: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে কিছু সেনাসদস্যের হাতে তিনি সপরিবারে নিহত হন।
বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের পরিধি ইতিহাসজুড়ে বিস্তৃত। রাজনৈতিক উত্থান-পতন, দীর্ঘ কারাবাস ও সংগ্রাম মুখরিত তাঁর জীবন আধুনিক বাংলাদেশের জন্মসূত্রের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে আছে।