জিয়াউর রহমান জীবনী ও ইতিহাস |

জিয়াউর রহমান কে? জিয়াউর রহমানের জীবনীতে পড়ুন তাঁর জন্ম, সামরিক জীবন, ১৯৭১ সালের ভূমিকা, রাষ্ট্রপতি হিসেবে কার্যক্রম, বিএনপি প্রতিষ্ঠা, বিতর্ক এবং মৃত্যু।

Ziaur 696c9884196df

Biography

জিয়াউর রহমান কে?

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সেনাপ্রধান, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টায় তিনি নিহত হন।

১. জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

  • জন্ম তারিখ: ১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬

  • জন্মস্থান: বাগবাড়ী গ্রাম, গাবতলী উপজেলা, বগুড়া জেলা

  • বাবা: মনসুর রহমান (কলকাতায় একজন রসায়নবিদ হিসেবে চাকরি করতেন)

  • মা: জাহানারা খাতুন

  • শৈশব: তাঁর শৈশবের একটি বড় অংশ কলকাতায় কেটেছে। দেশভাগের পর পরিবারটি করাচিতে স্থানান্তর হয়।

  • দাম্পত্য জীবন: ১৯৬০০ সালে তিনি খালেদা খানম পুতুলের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি পরবর্তীতে খালেদা জিয়া নামে পরিচিত হন। বেগম খালেদা জিয়া পরবর্তীতে তিন মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

  • সন্তান: তাঁদের দুই সন্তান—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। বর্তমানে তারেক রহমান বিএনপির নেতৃত্বের দায়িত্বে আছেন এবং আরাফাত রহমান ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন।

২. শিক্ষাজীবন ও সামরিক জীবন

  • প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা: করাচি একাডেমি স্কুল।

  • উচ্চমাধ্যমিক: করাচির ডি জে বিজ্ঞান কলেজ।

  • সামরিক বাহিনীতে যোগদান: ১৯৫৩ সালে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৫৫ সালে কমিশন লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে দায়িত্ব পালন করেন।

  • ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ: ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি খেমকারান সেক্টরে সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধের সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘হিলাল-ই-জুরাত’ পদক প্রদান করে।

৩. ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ভূমিকা

১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমান মেজর পদে চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। ২৫ মার্চের কালরাতের পর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

  • স্বাধীনতার ঘোষণা: ২৭ মার্চ তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। উক্ত ঘোষণায় তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে কথা বলছেন বলে উল্লেখ করেন।

  • সেক্টর ও ব্রিগেড কমান্ডার: মুক্তিযুদ্ধে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁর নামের আদ্যক্ষর দিয়ে গঠিত ‘জেড ফোর্স’ (Z Force)-এর অধিনায়ক হিসেবে বীরত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

  • বীর উত্তম খেতাব: স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীরত্বসূচক ‘বীর উত্তম’ খেবাতে ভূষিত করে।

(নোট: স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক বিদ্যমান, যেখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান ভিন্ন এবং ইতিহাসবিদদের মধ্যেও নানা মতামত পরিলক্ষিত হয়।)

৪. স্বাধীন বাংলাদেশে সেনাবাহিনী ও রাজনীতির পট পরিবর্তন

স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে উপসেনাপ্রধান হন।

  • ১৯৭৫ সালের আগস্টের পটপরিবর্তন: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হলে খন্দকার মোশতাক আহমদ ক্ষমতা নেন এবং জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান নিযুক্ত করা হয়। (এই সময়ের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা বিতর্ক রয়েছে।)

  • ৩ ও ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলী: ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানে জিয়া গৃহবন্দি হন। পরবর্তীতে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি মুক্ত হন এবং দেশের অন্যতম কার্যকর নেতৃত্বে চলে আসেন।

  • সামরিক শাসন: তৎকালীন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি থাকলেও জিয়াউর রহমান প্রথমে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরবর্তীতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

৫. রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান (১৯৭৭ – ১৯৮১)

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই বছরের ৩০ মে আয়োজিত গণভোটে তিনি বিপুল জনসমর্থন লাভ করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হন।

  • বিএনপি প্রতিষ্ঠা: ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করেন।

  • ১৯৭৯ সালের নির্বাচন: ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে। একই বছর তিনি সামরিক আইন প্রত্যাহার করে দেশে পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন।

তাঁর শাসনামলের প্রধান প্রধান উদ্যোগ ও কর্মসূচি:

  1. ১৯ দফা কর্মসূচি: দেশগঠন ও সামাজিক উন্নয়নে ১৯ দফা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপরেখা ঘোষণা।

  2. পল্লী উন্নয়ন: গ্রাম সরকার, স্বনির্ভর গ্রাম কর্মসূচি এবং সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি চালুকরণ।

  3. কৃষি ও শিক্ষা: কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গণশিক্ষা ও সাক্ষরতা অভিযান পরিচালন।

  4. জনশক্তি রপ্তানি: মধ্যপ্রাচ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি।

  5. আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (OIC)-র সাথে সম্পর্ক জোরদার এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব উত্থাপন (যা পরবর্তীতে সার্ক / SAARC গঠনের ভিত্তি তৈরি করে)।

  6. বেসরকারি খাত: রপ্তানিমুখী শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করা।

৬. জাতীয়তাবাদ ও রাজনীতিতে আদর্শিক পরিবর্তন

জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর স্থলাভিষিক্ত করে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ নীতি প্রবর্তন করেন। সংবিধানে তিনি “বিসমিল্লাহির-রহমানির-রহিম” এবং “আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” সংযোজন করেন, যার মাধ্যমে সংবিধানের মূল চার নীতির অন্যতম ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ সংশোধিত হয়। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে আদর্শিক বিভাজন সুনির্দিষ্ট রূপ নেয়।

৭. সমালোচনা ও বিতর্ক

জিয়াউর রহমানের শাসনামল নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা ও আইনি বিতর্ক রয়েছে:

  • সামরিক শাসনের সংহতকরণ: সামরিক বাহিনীর মধ্য থেকে ক্ষমতায় আগমন ও তা সংহত করা।

  • বিদ্রোহ দমন: তাঁর শাসনামলে সামরিক বাহিনীতে একাধিক ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টা ঘটে, যার পর সামরিক আদালতে অনেক সেনা সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

  • ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধে প্রণীত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বহাল রাখা ও সংবিধানে তা অন্তর্ভুক্ত করা।

  • সংবিধানের ৫ম সংশোধনী: সামরিক শাসনের সিদ্ধান্তসমূহকে বৈধতা দিতে গৃহীত ৫ম সংশোধনী পরবর্তীতে ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত হয়।

  • ধর্মভিত্তিক রাজনীতি: ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

(তবে তাঁর সমর্থকরা মনে করেন, তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এনেছিলেন, অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করেছিলেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছিলেন।)

৮. নির্মম হত্যাকাণ্ড ও মৃত্যু

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে জিয়াউর রহমান এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টার সময় নির্মমভাবে নিহত হন। মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর একটি অংশ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে অভিযুক্ত হয়। পরবর্তীতে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের চন্দ্রিমা উদ্যানে তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়।

এক নজরে জিয়াউর রহমানের সংক্ষিপ্ত তথ্য表

বিষয়তথ্য
পূর্ণ নামজিয়াউর রহমান
জন্ম তারিখ১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬
জন্মস্থানবাগবাড়ী, গাবতলী, বগুড়া
পিতা-মাতাপিতা: মনসুর রহমান, মাতা: জাহানারা খাতুন
স্ত্রীবেগম খালেদা জিয়া (সাবেক প্রধানমন্ত্রী)
সন্তানতারেক রহমান (বিএনপির বর্তমান প্রধান), আরাফাত রহমান কোকো
বীরত্বসূচক খেতাববীর উত্তম
রাজনৈতিক দলবাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
রাষ্ট্রপতিত্বের মেয়াদ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১
মৃত্যু৩০ মে ১৯৮১ (চট্টগ্রাম)

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন ১: জিয়াউর রহমান কত সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন?

উত্তর: তিনি ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে পদে বহাল থাকেন।

প্রশ্ন ২: বিএনপি কবে এবং কার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়?

উত্তর: ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রশ্ন ৩: মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য জিয়াউর রহমান কী খেতাব পান?

উত্তর: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ বীরত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে।

প্রশ্ন ৪: জিয়াউর রহমান কীভাবে মৃত্যুবরণ করেন?

উত্তর: ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক সেনাজোটের অভ্যুত্থান চেষ্টার সময় তিনি নির্মমভাবে নিহত হন।

উপসংহার

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বর্ণাঢ্য ও প্রভাবশালী চরিত্র। তিনি মাঠপর্যায়ের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান, সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশের সেবা করেছেন। তাঁর প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং গঠিত দল বিএনপি আজও দেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান শক্তি। তাঁর সামগ্রিক মূল্যায়ন নিয়ে নানা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে; পাঠক হিসেবে একাধিক ঐতিহাসিক দলিল ও উপাদান পর্যালোচনার মাধ্যমে তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে নিজস্ব বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।

Press Nation Bangladesh

Share with