যশোরের কেশবপুরে নাজমুল হাসান শান্ত নামে এক অটো চালক নিজের আয় দিয়ে এক লাখ গাছ লাগানোর কাজ করছেন। ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন বন বিভাগ কর্তৃপক্ষ। যশোরের আট উপজেলায় ১ লাখ ফলদ ও বনজ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে তার।
বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে যশোর-চুকনগর সড়কের কেশবপুর উপজেলার মধ্যকুল আমতলা এলাকায় গাছ লাগানোর সময় শান্ত তার ইচ্ছার কথা জানান। ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ দেখে পথচারীরাও তাকে সাধুবাদ জানান।
নাজমুল হাসান শান্তর বাড়ি কেশবপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। সকালে ঘুম থেকে উঠে অটো নিয়ে বেরিয়ে পড়েন রোজগারের জন্য। সারাদিন যাত্রী পরিবহনের আয় দিয়ে সংসার চালান তিনি। পরিবার নিয়ে যশোরে থাকেন। প্রতিদিনের আয় থেকে কিছু টাকা জমিয়ে গাছ লাগানোর জন্য পরিবারের খরচ মেটান। অটোর পেছনে গাছ লাগানোর মৌসুমে গাছের চারা, কোদাল ও করাত রাখা হয়। যাত্রা বিরতিতে রাস্তার ধারে বা দৃষ্টিনন্দন কোনো পরিত্যক্ত স্থান সেখানে নেমে পড়লেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটি খুঁড়ে চারা রোপণ করেন। এভাবে গত দুই বছরে তিনি যশোর জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দুই হাজার চারা রোপণ করেছেন। তার স্বপ্ন 1 লাখ গাছ লাগানো এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্য রেখে যাওয়া।
যশোরের কেশবপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা শান্তার জীবন সংগ্রামের গল্পও কম কঠিন নয়। বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং মা একজন গৃহিণী। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। সংসারের দায়িত্ব নিতে, জীবিকার জন্য বেছে নেন অটো চালনার পেশা। বর্তমানে নাজির তার স্ত্রী, সন্তান, ছোট ভাই ও বাবা-মা নিয়ে যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন।
জীবিকার ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবেশ নিয়ে চিন্তা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। নির্বিচারে গাছ কাটা, তীব্র তাপ, কমে যাওয়া সবুজ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি ২০২৪ সালে গাছ লাগানো শুরু করেন। কোনো সরকারি প্রকল্প, এনজিও বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত না হয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী গাছ কিনে রোপণ শুরু করেন। প্রথমে কয়েকটি গাছ, পরে তা শতাধিক ছাড়িয়ে এখন 2000 ছুঁয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শান্তর অটো শুধু যাত্রীবাহী বাহন নয়। এতে গাছ লাগানো ও লাগানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রয়েছে। রাস্তার ধারে যেখানেই খালি জায়গা বা উপযুক্ত জায়গা দেখা যায়, সেখানেই তিনি চারা রোপণ করেন। তিনি শুধু গাছ লাগিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করেন না, সেই পথে হাঁটার সময় গাছের অবস্থাও দেখেন। কোথাও গাছ শুকিয়ে গেলে নতুন চারা রোপণের চেষ্টা করেন।
কেশবপুরের মধ্যকুল এলাকায় গাছ লাগাতে গিয়ে ২৬ বছর বয়সী শান্তা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই গাছ ভালোবাসি। কিন্তু গত কয়েক বছরে যেভাবে গাছ কাটা বেড়েছে তাতে মনে হয় আফসোস করাই যথেষ্ট নয়, নিজের জায়গা থেকে কিছু করার। আমি বিশ্বাস করি যে আজ একটি গাছ লাগানো ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য নিরাপদ শ্বাস নিশ্চিত করার একটি প্রচেষ্টা। তাই যশোরের আট উপজেলায় পর্যায়ক্রমে এক লাখ গাছ রোপণ করে সবুজের সৃষ্টি করব।’
নিজের উপার্জন দিয়ে গাছের চারা কিনুন। তিনি বলেন, ‘অটোর আয় খুব বেশি নয়। তবে সংসারের খরচ মিটিয়ে গাছের জন্য কিছু টাকা রাখি।’
শান্তার গাছ লাগানোর ব্যক্তিগত উদ্যোগে পথচারীরাও মুগ্ধ। বৃহস্পতিবার বৃক্ষ রোপনের সময় রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মণিরামপুর উপজেলার দূর্বাডাঙ্গা গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, অটো চালকের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। পরিবেশ রক্ষায় তার কাজ ইতিবাচক সাড়া।
এ বিষয়ে কেশবপুর উপজেলা বন বিভাগের কর্মকর্তা সমীরণ বিশ্বাস জানান, নাজমুল হাসান শান্তর কাছে জেলাব্যাপী বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথা এসেছে। সবুজায়নের উদ্দেশ্যে বৃক্ষ রোপণে ব্যক্তিকে উৎসাহিত করতে হবে। আমি তার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।