বিচারপ্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘এআই ব্যবহার করে বিচারিক সিদ্ধান্ত, রায় লেখা কিংবা সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মানুষের কণ্ঠস্বর নিখুঁতভাবে নকল করার সক্ষমতাও ভবিষ্যতে বিচার বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের সম্মেলনকক্ষে ই-পারিবারিক আপিল আদালতের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বিচার প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থীদের জন্য ন্যায়বিচার সহজলভ্য করতে হবে। ই-বেইল বন্ড চালুর সুফল মানুষ ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে। ভবিষ্যতে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সাক্ষ্য গ্রহণ ও হাজিরার ব্যবস্থা চালু করা গেলে সময়, অর্থ ও ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘ই-জুডিশিয়ারি কার্যকর করতে হলে বিচারিক কার্যক্রমের সব পর্যায়কে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। এতে সময় ও অর্থের সাশ্রয় হবে। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে বিচারকদেরও নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।’
বিচারকদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বিচার বিভাগের সামনে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে এআই। এআই ব্যবহার করে রায় লেখা কিংবা সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এআই মানুষের কণ্ঠস্বরও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নকল করতে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিচারকদের ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্পর্কে আরও দক্ষ হতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও ভরসা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিচারকরা যেন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।’ বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের বিচারকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বিচারব্যবস্থাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা করেন তিনি।
দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৬ লাখের বেশি উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রায় দুই হাজার ৩০০ বিচারকের পক্ষে এত বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করা পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। এতে বিচারকদের ওপর অমানবিক চাপ তৈরি হচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো মহানগরগুলোতে মামলার চাপ আরও বেশি।’
তিনি বলেন, ‘যেসব আদালতে মামলার চাপ বেশি, সেখানে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে সক্ষম ও সক্রিয় বিচারিক কর্মকর্তাদের পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শুধু চাকরি করার মানসিকতা নয়, বিচারিক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রাখার মানসিকতা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে যোগ্য কর্মকর্তাদের বাছাই করে গুরুত্বপূর্ণ আদালতগুলোতে পদায়ন করা হবে।’
কিছু বিচারিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘কোনও কোনও কর্মকর্তা সকাল ১১টার দিকে কাজে এসে দুপুর ২টা বা ৩টার মধ্যে চলে যান বলে তাদের কাছে প্রতিবেদন রয়েছে। এ ধরনের আয়েশি কর্মপদ্ধতি গ্রহণযোগ্য নয়। দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিচারপ্রার্থীরা আদালতে এসে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস হয়রানির শিকার হন, এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিচারিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনার মাধ্যমে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে।’
বিচারব্যবস্থাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং বিচার বিভাগকে জনবান্ধব করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘বিচারপ্রার্থীরা যেন আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়ে আস্থা রাখতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের আরও সচেতন, দায়িত্বশীল ও সময়োপযোগী হতে হবে।’