চীনে উচ্চ শিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বাংলাদেশিদের

10212485d3f2f06116f37481d0109a7e 6ac8d6108ea7a 10212485d3f2f06116f37481d0109a7e 6ac8d6108ea7a
10212485d3f2f06116f37481d0109a7e 6ac8d6108ea7a

বছরখানেক আগে চীনের সর্বোচ্চ সম্মানজনক ও সর্বাধিক সুবিধাসম্পন্ন চীনা সরকারি বৃত্তি পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের ছয় শিক্ষার্থী। তাদের একজন মো. মারজুল ইসলাম। তিনি চীনের ‘চিনান বিশ্ববিদ্যালয়ে’ চাইনিজ স্টাডিজ বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। চীনে উচ্চশিক্ষা এবং সেদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি বাংলাদেশিরা কিভাবে আকৃষ্ট হচ্ছেন তা তুলে ধরেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউনকে মারজুল বলেন, ‘গতবছর স্কলারশিপ পেয়ে চীনে পড়াশোনা করার দারুণ একটা সুযোগ পেয়েছি। বাংলাদেশ থেকে চীনে আসার জন্য বিমান ভাড়া থেকে শুরু করে টিউশন ফি, আবাসন খরচ, যাতায়াত ব্যয়, স্বাস্থ্যবিমা, বার্ষিক শিক্ষাসফর, প্রাতিষ্ঠানিক ফি (খেলাধুলা, লাইব্রেরি, হল ফি, সেমিস্টার ফি ইত্যাদি) সবকিছু ফ্রিতে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মাসিক ৩ হাজার ইউয়ান (প্রায় ৫০ হাজার টাকা) ভাতা দেওয়া হচ্ছে।’’

তিনি জানান ‘‘আমাদের আগের শিক্ষাবর্ষে তিনজন শিক্ষার্থী চীনে মাস্টার্স অধ্যয়ন করার সুযোগ পেয়েছেন। একই মানের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট স্কলারশিপে। আমরা এসেছি ৬ জন। এবার নিশ্চয়ই বাড়বে। এভাবে ধীরে ধীরে চীনে উচ্চ শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আলাদা একটা আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশি অনেক শিক্ষার্থী উহান বিশ্ববিদ্যালয়, বেইজিং ভাষা ও সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে, লানচৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা, নর্থওয়েস্ট নরমাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।

তার মতে, অর্থনীতি এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের মতো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চীন ও বাংলাদেশে শিক্ষা, ভাষা ও সাংস্কৃতিক বোঝাপড়াটাও বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, চীন অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক উন্নত। এর বাইরে তাদের সংস্কৃতিও চমৎকার, অনেকটা বাংলাদেশিদের মতো। তাদের ভাষায় (মান্দারিন) এখানে তাদের সঙ্গে কথা বললে অনেক বেশি আতিথেয়তা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়— যা এখানে আসা শিক্ষার্থীদের পথচলা সহজ করে তোলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, চীনে উচ্চ শিক্ষায় আগ্রহী এবং চীনা ভাষা শেখায় আগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বাড়ছে।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে দেশটির সংস্কৃতি ও শিক্ষার প্রভাব বিশ্বজুড়ে। গত এক দশক ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যে বিদ্যমান সম্পর্ক সেটাই তার প্রমাণ দিচ্ছেন।

চীনের ভাষা, সংস্কৃতি ও সিনেমার জনপ্রিয়তা বাড়ছে বাংলাদেশে

চীনের তৈরি পণ্যের মতো দেশটির ভাষা ও সংস্কৃতি দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে সারাবিশ্বে। বিশেষ করে চায়নিজ খাবার, সিনেমা ও ড্রামা সিরিজের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে বাংলাদেশে। চীনের মহাকাশভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ‘শেনচৌ থার্টিন’ তেমন একটি কাব্যিক অভিযাত্রা তবে বাস্তব অনুভূতি। সিনেমাটিতে বিজ্ঞান ও সৌন্দর্য মিলেমিশে একাকার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালিসহ ৩৫টির বেশি দেশের মতো বাংলাদেশেও দেখানো হয়েছে এটি।

এছাড়াও বেশ কিছু সিনেমা বাংলাদেশ তথা বিশ্বেজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য, চেন কাইগে পরিচালিত ফেয়ারওয়েল মাই কনকিউবাইন, ঝাং ইমো পরিচালিত টু লাইভ ও রাইজ দ্য রেড ল্যান্টার্ন, দ্য ব্যাটল অ্যাট লেক চ্যাংজিন, নে ঝা, উল ওয়ারিয়র ২।

এদিকে সংস্কৃতি ও ভাষার প্রচারে বিশ্বব্যাপী কাজ করছে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের চীনা পরিচালক ড. ইয়াং হুইয়ের মতে, চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষ্টির মিল রয়েছে। এতে করে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও কবিতা উৎসবের মতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাড়িয়েছে।

ড. ইয়াং হুইয়ের দাবি, চীনা ভাষা শেখায় আগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়ছে বাংলাদেশে। ঢাকার চীনা দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি দেশটির বিভিন্ন বৃত্তি, গবেষণা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ক্রমেই বাড়ছে।

বাংলা শিখতেও আগ্রহ বাড়ছে চীনা শিক্ষার্থীদের

চীনে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ এবং চীনা ভাষা শেখার প্রতি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ যেমন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, তেমনি ‘বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি’ বিষয়ে পড়াশোনার প্রতিও চীনা শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) তথ্যানুযায়ী, গত তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষার বিশেষ কোর্সে অংশ নেওয়া চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫ থেকে বেড়ে ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে চীনা শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে প্রায় ৭৩ শতাংশ।

আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চীনের গুয়াংডং ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজ ও ইউনান মিনজু ইউনিভার্সিটি থেকে মোট ১৫ জন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষার বিশেষ কোর্সে অংশ নেন। ২০২৫ সালে ইউনান মিনজু ইউনিভার্সিটি, ইউনান ইউনিভার্সিটি ও বেইজিং ফরেন স্টাডিজ ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯ জন এবং চলতি ২০২৬ সালে ইউনান মিনজু ইউনিভার্সিটি, ইউনান ইউনিভার্সিটি, কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটি ও গুয়াংডং ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজ থেকে মোট ২৬ জন শিক্ষার্থী এ কোর্সে অংশ নিচ্ছেন। ফলে তিন বছরে বাংলা ভাষার বিশেষ কোর্সে চীনা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ১৫ থেকে ২৬ জনে উন্নীত হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, এ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ভাষা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান আগ্রহের প্রতিফলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার ও বন্ধুত্বপূর্ণ। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদার। দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, বোঝাপড়া ও বন্ধুত্ব আরও গভীর করতে ভাষা শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আমরা চীনা ভাষাসহ তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে চাই। একইভাবে চীনের শিক্ষার্থীরা যাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে, সে সুযোগও আমাদের আরও বাড়াতে হবে। ভাষা ও সংস্কৃতির বিনিময় দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। চীনা শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে এসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানছেন, এটি দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

চীনে উচ্চ শিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতির জনপ্রিয়তা নিয়ে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

সময় যত যাচ্ছে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন। বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের গত ৫০ বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্ন সুসম্পর্ক বজায় আছে। অর্থনৈতিক বিবেচনায় চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময় যতো যাচ্ছে এটি আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। সেদেশের ভাষা সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ পাচ্ছে। সেদেশের মানুষও বাংলা ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে সহায়ক হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ক্ষমতায় যে সরকারই আসুক না কেন চিনির সঙ্গে কিন্তু বাংলাদেশের সম্পর্কের কোন অবনতি ঘটেনি। বরং সম্পর্ক আরও গভীর হয়। সব সরকারের একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকে। সত্যি বলতে বিশ্বজুড়ে চীনের যে প্রভাব সেটা কিন্তু সবক্ষেত্রেই। এর কারণ চীনের বিশাল অর্থনীতি। তাদের প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি, কৃষিতে উদ্ভাবন, বাণিজ্য, ভাষা-সংস্কৃতি, খাওয়া-দাওয়া যেটাকে আমরা চায়নিজ ফুড বলি, এগুলোর প্রভাব বিশ্বব্যাপী। এশিয়ার নেতৃত্বেও চীনের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়।

অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি শিক্ষা ও ভাষা সংস্কৃতিতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শক্তিশালী হচ্ছে উল্লেখ্য করে তিনি বলেন, গত এক দশকে কিন্তু চীনে যে শিক্ষা বা তাদের যে সংস্কৃতি বা সামাজিক কর্মকাণ্ড এসব কিছু বাংলাদেশে ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা অনেক বাংলাদেশীকে স্কলারশিপ দিয়ে সেদেশে পড়াশোনা সুযোগ করে দিয়েছে। যদিও তা ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম তবে পূর্বের তুলনায় চীনে পড়াশোনা করতে যাওয়া বা সে দেশের ভাষা শিখে কর্মক্ষেত্রে যাওয়া বেড়েছে।

চীন-বাংলাদেশ শিক্ষা সহযোগিতা পৌঁছাবে নতুন উচ্চতায়

চীনের গুয়াংজুতে চীন-বাংলাদেশ শিক্ষা সহযোগিতা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সেখানে বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য চীনে পড়াশোনার সুযোগ বৃদ্ধি, চীন ও বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলা, দুই দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্ভাবনসহ নানান বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

এছাড়াও দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য চীন-বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা সহযোগিতা, দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে যৌথ পরিকল্পনার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এসময় চীন-বাংলাদেশ শিক্ষা সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এহছানুল হক মিলন।

এবিষয়ে চীনের চিনান বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি মারজুল ইসলাম বলেন, সরকারে এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ অধিক গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এছাড়াও দেশে যদি চীনা ভাষা শেখার জন্য সরকারি সহযোগিতায় নতুন করে উদ্দ্যোগ নেওয়া হয় তাহলে জনশক্তি রপ্তানির মধ্যে দিয়ে দেশে রেমিট্যান্সের নতুন দ্বার উন্মোচন হবে।

Add a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Keep Up to Date with the Most Important News

By pressing the Subscribe button, you confirm that you have read and are agreeing to our Privacy Policy and Terms of Use
Press Nation Bangladesh