সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পিটুলি মাংসের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। জেলার বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই খাবারটি একটি বিশেষ আকর্ষণ। দূরদূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই দাওয়াত দিতে গিয়ে পিটুলির মাংস খাওয়ার জন্য জোর দেন। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি খাবার নয়, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির অংশ।
সিরাজগঞ্জের মেজবানীতে কত বছর আগে পিটুলির মাংস ব্যবহার হতো তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। জীবনের শেষ প্রান্তে উপনীত প্রবীণরাও জানান, দাদা-দাদির কাছ থেকে তারা এই খাবারের প্রচলনের গল্প শুনেছেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই প্রথা এখনও টিকে আছে। পিটুলি মাংসের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। একটি হোস্ট ইভেন্টের আয়োজন করা হলে, আয়োজকরা অতিথিদের আপ্যায়ন করার জন্য এই খাবারটি রাখার চেষ্টা করেন। আমন্ত্রিত অতিথিরা পিটুলির মাংস খাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ছৌগাছা, বাগবাটি ও রতনকান্দি ইউনিয়নসহ পুরো কাজিপুর উপজেলায় পিটুলির মাংসের প্রচলন রয়েছে। পিটুলির মাংস সাধারণত তার ৪০তম জন্মদিন উপলক্ষে এলাকার কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি মারা গেলে, কেউ তার জন্য দোয়া করতে বা আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখতে হজে গেলে রান্না করা হয়।
এই অনুষ্ঠানের একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হল যে গ্রামে এই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় সেখানে মহিলা, পুরুষ এবং শিশু সহ গ্রামের প্রায় সকল মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। গ্রামবাসীরাও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিনামূল্যে খাবার তৈরিতে সাহায্য করে। আগে খাবার পরিবেশনের জন্য বিভিন্ন গ্রাম থেকে কলা পাতা সংগ্রহ করা হতো। এই অনুষ্ঠানের ঐতিহ্য ছিল কলাপাতার ওপর অতিথিদের খাবার পরিবেশন করা। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্লাস্টিকের প্লেট ও গ্লাসের ব্যবহার বেড়েছে।
পিটুলি মাংস প্রস্তুত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি প্রয়োজন। রান্নার জন্য বড় ডেকচি রাখতে চাট ব্যবহার করা হয়। অনুষ্ঠানের আগে, অতিথিদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয় এবং আমন্ত্রণ জানানো হয়। তালিকায় এলাকার প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। পিটুলি রান্নার প্রধান উপকরণ গরু বা মহিষের মাংস এবং আতপ চালের গুঁড়া।
অনুষ্ঠানের আগের দিন বিকেল থেকেই রান্নার প্রস্তুতি শুরু হয়। শেফের নির্দেশ অনুযায়ী মাংস কাটা হয়। এরপর একাধিক চুলা তৈরি করে মধ্যরাত থেকে রান্না শুরু হয়। রান্নার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে চালের গুঁড়া মাংসের সঙ্গে মেশানো হয়। ঐতিহ্যবাহী পিটুলির মাংস এই বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়।
ফজরের নামাজের পর অতিথিদের খাওয়ানো হয়। খাবার পরিষেবা সাধারণত সকাল 10 টার মধ্যে শেষ হয়। ভাত, পিটুলির মাংস ও ঘোল পরিবেশনের দায়িত্বে আলাদা লোক। ওয়েটাররা অতিথিদের খাবার পৌঁছে দেয়। ভাত ও পিটুলির মাংস সাধারণত একবারই দেওয়া হয়। খাবার শেষে ঘোল পরিবেশন করা হয়। হোস্ট পরিবার তদারকি করে যে মূল খাবারটি সঠিকভাবে পরিবেশন করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার পিপুলবাড়িয়া এলাকার আবুল হোসেন (৭০) বলেন, সিরাজগঞ্জ পিটুলির আকর্ষণ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। অতিথি এলে পিটুলি খাওয়ার দাবি রাখে। পিটুলি না খেলে অতিথিদের দাওয়াত অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।’
কাজিপুরের মাইজবাড়ি এলাকার আয়নাল হক বলেন, ‘আমাদের এলাকার পিটুলির সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই এলাকায় কেউ বেড়াতে এলে পিটুলি খাওয়াতে হয়।’ তিনি আরও বলেন, ঢাকায় অনেক অনুষ্ঠানে সিরাজগঞ্জ থেকে বাবুর্চি ভাড়া করে পিটুলি রান্না করা হয়।
পিটুলি তৈরির বিশেষ কৌশল সম্পর্কে বাবুর্চি হোসেন আলী বলেন, ‘পিটুলির মাংসে টাটকা চালের গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। ভাত থেঁতলে দিতে হবে। মাংসে যোগ করার সময় চালের গুঁড়া যেন ভেজা থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পিটুলি তৈরির কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশল রয়েছে। এসব কৌশলের কারণে কাজিপুরের পিটুলির সুনাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।