সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর থেকে পুলিশ ও এসআরবির যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জানা যায়, দেবহাটা সার্কেল, কালীগঞ্জ থানা, দেবহাটা থানা ও এসআরবি (স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন)-৬ এর সদস্যরা যৌথ অভিযান চালিয়ে আমিনীকে আটক করে।
এর আগে গত মঙ্গলবার দেবহাটায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে শামীমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি দেবহাটার সুবর্ণবাদ গ্রামের বাসিন্দা।
এ বিষয়ে দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচএম শাহীন বলেন, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় আমিনীকে আটক করা হয়েছে। গ্রেফতারের সময় তার নিজের মোবাইল ফোন সঙ্গে ছিল না। সে আলাদা সিম ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করত। নিজের পরিচয় দিয়ে কারো সাথে কথা বলার জন্য সেই সিমটি ব্যবহার করুন। যোগাযোগের তথ্যের ভিত্তিতে তাকে শনাক্ত করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে এখনও উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। আজ আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হবে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে নিহত শামীমের বড় ভাই আব্দুল জলিল বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
গত শুক্রবার সকালে পুলিশ ৫ ও ৬ নম্বর আসামি মোক্তার হোসেন খান (৫৩) ও আসাদুল ইসলাম মল্যাকে (৪৬) গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।
সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানান ওসি।
এ প্রসঙ্গে শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান বলেন, ‘মূল আসামি গ্রেপ্তারের খবরে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। এখন আমরা শুধু চাই, আমার ভাইয়ের ওপর যে অবিচার হয়েছে, রাষ্ট্র তার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করুক। এ ঘটনায় জড়িতদের বিদ্যমান আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ সাজা দিতে হবে। এছাড়া আমার ভাইয়ের দুই এতিমের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সরকারের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।’
মামলার অন্য আসামিদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে তৌসিফ বলেন, ২ ও ৩ নম্বর আসামি কামরুল গাজী ও সাদিকুলকে গ্রেফতার করা হলে কারা এ ঘটনায় জড়িত এবং কারা মূল ভূমিকা পালন করেছে সে বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যাবে।
তার দাবি কামরুল গাজী পুলিয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি। তবে সাদিকুলের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নন।
দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইমদাদুল হক বলেন, শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি ঘটনার নিন্দা করে বলেন, জামায়াত এ ধরনের সহিংসতা সমর্থন করে না।
ইমদাদুল হক বলেন, মামলায় ৮ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি কামরুল গাজীর নাম উল্লেখ করায় তাকে ষড়যন্ত্র করে আসামি করা হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
কামরুল গাজী ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলে দাবি করেন তিনি। উদ্দেশ্যমূলকভাবে তার নাম দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে বলেও দাবি করেন ইমদাদুল হক।
নিহত শামীমের পরিবার জানায়, শামীম দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গত সোমবার তার ও তার স্ত্রীর তর্কের একটি অডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। তার বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং অডিওটিতে নিন্দামূলক মন্তব্য রয়েছে এমন অভিযোগের পরে তাকে স্থানীয় বাজারে মারধর করা হয়েছিল। পরে তিনি বিষ খেয়েছেন বলে পরিবার জানিয়েছে। স্থানীয় জিপি। পরদিন শত শত লোক সবুরের চেম্বারে জড়ো হয়ে তাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে মারধর করে। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।
দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর শতাধিক লোক ওয়ার্ডে ঢুকে শামীমকে আবারও মারধর করে। আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও শ্রমিকরা বাধা দিতে ব্যর্থ হয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালের কয়েকটি ক্যামেরা সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সব ফুটেজ দেখা সম্ভব হয়নি। পুলিশ এখনো তাদের কাছে ফুটেজ জানতে চায়নি। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফুটেজ সংরক্ষণের চেষ্টা করছে।