শেখ হাসিনার জীবনী জীবনী ও ইতিহাস |

শেখ হাসিনা কে? শেখ হাসিনার জীবনীতে পড়ুন তাঁর জন্ম, পরিবার, শিক্ষা, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব, প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কাল, বিতর্ক এবং ২০২৪ সালের পর বর্তমান অবস্থা।

Images 11

Biography

শেখ হাসিনা কে?

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা। তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মোট চার মেয়াদে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন:

  • প্রথম মেয়াদ: ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল

  • পরবর্তী টানা তিন মেয়াদ: ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল

বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে দীর্ঘ সময় সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করার রেকর্ড রাখেন।

১. জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

  • জন্ম তারিখ: ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭

  • জন্মস্থান: টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ জেলা

  • বাবা: শেখ মুজিবুর রহমান

  • মা: বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

  • ভাইবোন: পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর অন্য ভাইবোনেরা হলেন—শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেল।

  • দাম্পত্য জীবন: ১৯৬৮ সালের ১৭ নভেম্বর তিনি বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

  • সন্তান: তাঁদের দুই সন্তান—ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।

২. শিক্ষাজীবন ও ছাত্ররাজনীতি

  • প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা: আজিমপুর গার্লস স্কুল।

  • উচ্চমাধ্যমিক: সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমানে বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ)। এখানে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (VP) নির্বাচিত হন।

  • উচ্চশিক্ষা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তিনি রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি তাঁর বাবার রাজনৈতিক সংগ্রাম কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন।

৩. ১৯৭৫ সালের ট্র্যাজেডি ও নির্বাসিত জীবন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। ঐ সময় শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন, যার ফলে তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান।

পরবর্তী ৬ বছর তাঁকে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। ১৯৮১ সালে তাঁর অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাঁকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি দেশে ফেরেন এবং সরাসরি দলীয় নেতৃত্বের হাল ধরেন।

৪. এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও বিরোধী দলের নেতৃত্ব

আশির দশকে তৎকালীন এরশাদ সরকারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনে শেখ হাসিনা রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এ সময় তাঁকে একাধিকবার গৃহবন্দি করা হয়।

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করতে না পারায় শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

৫. প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রিত্ব (১৯৯৬ – ২০০১)

১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

এই মেয়াদের প্রধান প্রধান অর্জন:

  1. গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি (১৯৯৬): ভারতের সাথে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর।

  2. পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি (১৯৯৭): পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসনে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর।

  3. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি (১৯৯৮): শান্তিতে অবদানের জন্য ইউনেসকোর হুফে বোয়ানি শান্তি পুরস্কার লাভ।

(নোট: ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয় এবং বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করে।)

৬. গ্রেনেড হামলা ও কারাবাস

  • ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা (২০০৪): ঢাকায় আওয়ামী লীগের এক মহাসমাবেশে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে ২৪ জন নিহত হন। শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও তাঁর শ্রবণশক্তি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

  • জরুরি অবস্থা ও কারাবাস (২০০৭–২০০৮): ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০৮ সালের জুনে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

৭. টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় (২০০৯ – ২০২৪)

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর মাধ্যমে টানা চার মেয়াদে (সর্বমোট পাঁচ মেয়াদে) ক্ষমতায় থাকেন।

এই মেয়াদের প্রধান প্রধান উদ্যোগ ও অর্জন:

  • পদ্মা সেতু: নিজস্ব অর্থায়নে দেশের সর্ববৃহৎ এই অবকাঠামোটি নির্মিত হয় এবং ২০২২ সালের জুনে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

  • ঢাকা মেট্রোরেল: ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করে।

  • মেগা প্রকল্পসমূহ: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু টানেল, কক্সবাজার রেললাইন ইত্যাদি বাস্তবায়ন।

  • সমুদ্রসীমা জয়: মিয়ানমার ও ভারতের সাথে আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্রসীমা বিরোধের দীর্ঘমেয়াদি নিষ্পত্তি।

  • স্থলসীমানা চুক্তি (২০১৫): ভারতের সাথে ঐতিহাসিকভাবে ঝুলে থাকা ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়ন।

  • অন্যান্য: ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্প বাস্তবায়ন, দেশব্যাপী বিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারণ, দারিদ্র্যের হার হ্রাস, ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান এবং বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের যোগ্যতায় পৌঁছানো।

  • আন্তর্জাতিক সম্মাননা: ২০১৫ সালে পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য জাতিসংঘ থেকে ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার লাভ।

 

এক নজরে শেখ হাসিনার সংক্ষিপ্ত তথ্য

বিষয়তথ্য
পূর্ণ নামশেখ হাসিনা ওয়াজেদ
জন্ম তারিখ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭
জন্মস্থানটুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ
পিতা-মাতাপিতা: শেখ মুজিবুর রহমান, মাতা: বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব
স্বামীড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া
সন্তানসজীব ওয়াজেদ জয় (ছেলে), সায়মা ওয়াজেদ পুতুল (মেয়ে)
রাজনৈতিক দলবাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ১৯৯৬–২০০১ (১ম মেয়াদ) এবং ২০০৯–২০২৪ (২য় থেকে ৫ম মেয়াদ)
বর্তমান অবস্থানভারত

 

উপসংহার

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরিবার হারানোর ট্র্যাজেডি, দীর্ঘ নির্বাসন, এরশাদবিরোধী আন্দোলন, একাধিকবার কারাবাস ও হত্যাচেষ্টা পেরিয়ে তিনি চার মেয়াদে দেশ শাসন করেছেন। তাঁর শাসনামলে দেশের মেগা অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি যেমন প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী, তেমনি গণতন্ত্রের অবক্ষয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভোটাধিকার হরণের মতো গুরুতর অভিযোগে তাঁর পতনও ঘটেছে। ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আগামী দিনগুলোতে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর এই দীর্ঘ অধ্যায়ের মূল্যায়ন নিশ্চিত করবেন।

Press Nation Bangladesh

Share with